Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

‘বাংকার গ্রামে’ কীর্তনের এলাহি আয়োজন, উড়ত পাচারের বিপুল টাকা

‘বাংকার গ্রামে’ কীর্তনের এলাহি আয়োজন, উড়ত পাচারের বিপুল টাকা
  • ৩১ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: প্রতি বছর মার্চ মাসে কীর্তন গানের আসর বসত নাঘাটা গ্রামে। স্থান, সুশান্ত ঘোষ ওরফে লাল মহারাজের বাড়ির উঠোন। এক সপ্তাহ ধরে চলত সেই অনুষ্ঠান। থাকত এলাহি আয়োজন। সকাল থেকে রাত—গ্রামের লোকজনকে নিয়ে চলত ভুরিভোজ। পাতে থাকত লুচি, ফ্রাইড রাইস, আলুর দম সহ হরেক মিষ্টি। শোনা যায়, ওই ক’টা দিন নাকি গ্রামে চলত অরন্ধন। হাজার হাজার মানুষ কীর্তন গান শুনতে এসে কব্জি ডুবিয়ে খেতেন। তিলকধারী মহারাজের প্রতি ভক্তিতে গদগদ হতেন। ‘বাঙ্কার কাণ্ড’-এর পর্দা ফাঁস হওয়ার পর গ্রামবাসীদের এখন আফসোসের শেষ নেই। কেউ কেউ বলছেন, ‘অপরাধ আড়াল করতে সুশান্ত ঘোষ যে এভাবে ভক্তিবাদের আশ্রয় নেবেন, তা ভাবলেই শিউরে উঠছি।’ 
Advertisement
শিউরে ওঠার এখানেই শেষ নয়। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, কীর্তন গান থেকে ভুরিভোজ—এলাহি আয়োজনে মহারাজের মূল ভরসা ছিল পাচারের কালো টাকা। সেই টাকা উড়িয়ে দু’টি কাজ হাঁসিল করতেন সুশান্ত। এক, গ্রামবাসীদের নজর ঘুরিয়ে রাখা। দুই, টাকার কালো রং সাদা করা। বাঙ্কার কাণ্ডের পর্দা ফাঁসের পর গা ঢাকা দিয়েছেন সুশান্ত। ফলে, এবছর মার্চে তাঁর কীর্তন গানের আসর বসবে না বলেই মনে করছেন অনেকেই।
গোয়েন্দাদের দাবি, সীমান্তের কাশির সিরাপ পাচারের চক্রের কিংপিন এই মহারাজ। নাঘাটাতে যে বিশাল চারটি বাঙ্কার ও বাজেয়াপ্ত হওয়া ৬২ হাজার বোতল নিষিদ্ধ কাশির সিরাপ পাওয়া গিয়েছিল, তা মহারাজেরই বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। কৃষ্ণনগর পুলিস জেলার এসপি অমরনাথ কে বলেন, ‘এই ঘটনার তদন্ত করছে এনসিবি। ভীমপুরে কাশির সিরাপ উদ্ধারের ঘটনায় মহারাজের নাম আমরা জানতে পেরেছি। তাঁর কোথায়, কত সম্পত্তি রয়েছে, তা আমরা তদন্ত করছি।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের শেষের দিক থেকে কীর্তন গান অনুষ্ঠানের প্রচার আয়োজন শুরু হয়ে যায়। নাঘাটা গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে অনুষ্ঠানে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়। এবছর সেই প্রচার পর্ব এখনও শুরু হয়নি। তাই নাঘাটা গ্রামে গুঞ্জন—‘এবার অনুষ্ঠান হবে তো?’  গ্রামবাসীদের অনুমান, বাজেয়াপ্ত হওয়া কাশির সিরাপ পদ্মাপারে পাচার করে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে এবছরও কীর্তনের আয়োজন করতেন মহারাজ। s 
জানা গিয়েছে, বিগত পাঁচ বছর ধরেই এই অনুষ্ঠান হয়ে আসছে মহারাজের বাড়ির চত্বরে। গ্রামবাসীদের কথায়, আগে ছোটোখাটো করে এই অনুষ্ঠান হতো। ২০২২ সাল নাগাদ সাধু মহারাজ পরিচয় পাওয়ার পর থেকে অনুষ্ঠানের চাকচিক্য বাড়তে থাকে। টানা সাতদিনের অনুষ্ঠানে কীর্তন মিছিল, লোক খাওয়ানো, সবকিছুর আয়োজন করা হয়। গ্রামবাসীদের খুশি রাখতে আয়োজনে কোনও খামতি রাখতেন না মহারাজ। 
কথায় কথায় গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন,  দৈনিক দশ লক্ষ টাকা করে খরচ করা হতো অনুষ্ঠানে। প্রতিদিন প্রায় দশ হাজার মানুষ পাত পেড়ে খেতেন। সকালের মেনুতে থাকত লুচি, আলুরদম, রসগোল্লা, দই, চাটনি, পাঁপড়। দুপুরে থাকত মিনিকিট চালের ভাত, ডাল, পনিরের তরকারি, লাল শাক, ঘি, সঙ্গে চাটনি, পাঁপড়, দই, মিষ্টি। সন্ধ্যার থালিতে থাকত, ফ্রাইড রাইস, আলুরদম।‌ রাতের মেনুতে রাখা হতো ভাত, ডাল, বিভিন্ন রকমের সব্জি, সন্দেশ, সহ একাধিক পদ। অনুষ্ঠান থেকে ভক্তদের গীতাও প্রদান করা হতো। বছরের এই সাতটা দিনই দেখা বাড়িতে যেত লাল মহারাজকে। অতিথি আপ্যায়নে থাকত তাঁর শাগরেদ গিরি, পঙ্কু, শুভ, গুড্ডু, রাজু, রানারা।
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ