শুভদীপ রায়, কলকাতা: সায়ন্তনী, সৌমাল্য, সৌপ্তিক আর নিবেদিতা। চারজনই দর্শনে অনার্স। থার্ড সেমেস্টার। দক্ষিণ কলকাতার নামজাদা এক কলেজের পড়ুয়া। একসঙ্গে বেরিয়েছে শপিং করতে। গন্তব্য গড়িয়াহাট। ওদের সঙ্গে যখন দেখা হল, সবার হাতই খালি। শুধুই ঘুরতে নাকি কেনাকাটাও হবে? উত্তরে একগাল হাসি। আসলে, দেখলাম আর কিনে ফেললাম—এই ফর্মুলায় বিশ্বাসী নয় চারজনই। কিন্তু এবারের ট্রেন্ড কী? সেখানেও শুধুই হাসি! মানে উত্তর নেই।
এই প্রজন্মের ফ্যাশন ট্রেন্ডটাই অদ্ভুত। কিছুই নির্দিষ্ট নয়। যেটা পছন্দ হবে সেটাই কিনব, সেটাই পরব। এককালে পুজোর শপিং মানেই ছিল—বছরের সবচেয়ে হিট সিনেমার হিরো যেমন পোশাক পরেছেন, তার নকল করা। তারপর এল ম্যাচিং-এর যুগ। জিন্সের সঙ্গে টি-শার্ট, টি-শার্টের সঙ্গে জুতো, জুতোর সঙ্গে ঘড়ি। জেন-জি সেই ধারা বদলে দিয়েছে। পুজোর ফ্যাশনের মন্ত্র একটাই, পোশাক যেন আরামদায়ক হয়।
সেই মন্ত্রেই বদলেছে জিনসের ধরন। কয়েক বছর আগেও জিনস মানেই ছিল শরীরের সঙ্গে সেঁটে থাকা স্কিনফিট। জেন-জির আলমারিতে এসব পিছনের দিকে। সামনের সারিতে ব্যাগি জিন্স। কোমর থেকে পা পর্যন্ত ঢিলেঢালা। স্বমহিমায় বর্তমান কারগো জিন্স। যত বেশি পকেট, তত বেশি ফ্যাশন। ফিরে এসেছে বুটকাট জিন্স। মানে গোড়ালি থেকে চওড়া। বাকিটা সাধারণ প্যান্টের মতো। এছাড়াও কটন চিনোস, গোর্ প্যান্টের চাহিদাও ভালো।
এবারে অবশ্য বাজার কাঁপাচ্ছে ওভারসাইজ টি-শার্ট। পুজোয় একটা জিন্স হলেও আপত্তি নেই সৌপ্তিক-সৌমাল্যদের। স্রেফ ওভারসাইজ টি-শার্ট অন্তত ৫-৬টা দরকার। জেন-জি’র এই চাহিদা ভালোমতো বুঝেছেন দোকানিরাও। এই গড়িয়াহাটেই দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ব্যবসা করছেন সুমন সমাদ্দার। বাড়ি ক্যানিংয়ে। এখানে ভাড়ায় থাকেন। পুজোর সময়টা দম ফেলার সময় থাকে না। এবারের ট্রেন্ড কী? প্রশ্ন শুনে তিনিও খানিক মাথা চুলকে ফেললেন। বললেন, ‘বছর খানেক আগেও একটাই ধরন সবাই এসে খোঁজ করত। সেটাই বেশি করে আনতাম। এখন সবার পছন্দ আলাদা আলাদা। তবে ঢিলাঢালা জিনসই বেশি বিক্রি হচ্ছে।’ ছবিটা এমন কিছু আলাদা নয় হাতিবাগানেও। এখানে অবশ্য টি-শার্টের রমরমা। গ্রাফিকের পাশাপাশি রয়েছে খুব সাধারণ ডিজাইনের টি-শার্ট। কোনোটায় স্রেফ একটা ছোট্ট লোগো। কোনোটায় সামনের দিকে ফাঁকা থাকলেও, পিছনের দিকে বড়ো ছবি। দর্পণা সিনেমার ঠিক আগে রাস্তার উপরই পসরা সাজিয়ে বসেছেন প্রশান্ত সেন। শুধুমাত্র টি-শার্ট বিক্রি করেন। দাম ২০০-৩০০ টাকার মধ্যে। পুজোর আগে ব্যবসা ভালোই হচ্ছে, জানালেন প্রশান্ত। আসলে, ছেলেদের আলাদা পোশাক, মেয়েদের আলাদা, এই ধারণাটাই বদলে দিয়েছে জেন-জি। ব্যাগি জিনস, ওভারসাইজ টি-শার্ট সবাই কিনছে।
তা বলে মেয়েদের ফ্যাশনে কি আলাদা ট্রেন্ড নেই? ঢের আছে। তালিকায় সবার উপরে বোহো, ইন্দো-ওয়েস্টার্ন ড্রেস। তবে সায়ন্তনী-নিবেদিতা শর্ট কুর্তি খুঁজতে এসেছে। সেইসঙ্গে উডেন ব্যাঙ্গল, মানে কাঠের চুড়ি। কেনার তালিকায় রয়েছে ক্রশেটও। আদতে উলের তৈরি জিনিস। তার হাই ডিমান্ড। শুধু নিজের পোশাক নয়, মোবাইল কভারটাও জেন-জির ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। তাই ওটাও নতুন চাই। সঙ্গে হ্যান্ডমেড ব্যাগের চাহিদাও আছে। কেনার তালিকা থেকে শাড়ি-পাঞ্জাবিও বাদ যায়নি। কাঁথাস্টিচ, মোডা সিল্কের পাশাপাশি চাহিদা কমেনি হ্যান্ডলুমেরও। এই পরিবর্তন কেন?
তারও যুক্তি আছে জেন-জির কাছে। পুজোয় ঠাকুর দেখা মানে প্রচুর হাঁটাহাঁটি। এক প্যান্ডেল থেকে অন্য প্যান্ডেল। তারপর পেটপুজো। একটু জিরিয়ে ফের রাতে বেরোনো। এই ম্যারাথনে ছুটতে গেলে পোশাক ঢিলাঢালা হতেই হয়। তাই এমন পোশাক চাই, যা দেখতে স্টাইলিশ, কিন্তু পরে আরাম। ব্যাগি জিনস আর ওভারসাইজ টি শার্ট সেই জায়গাতেই বাজিমাত করছে। সঙ্গে স্নিকার্স হলে তো কথাই নেই। এই প্রজন্ম চায়, প্যান্ডেল হপিংয়ের ক্লান্তি যেন শুষে নেয় বাহারি পোশাক। তবেই না পুজোয় মজা!