Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

একাকিত্ব ও ডিপ্রেশন: ভারতের নতুন মহামারী

স্ট্যানফোর্ড, হার্ভার্ড এবং নোতরদাম। আমেরিকায় এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সবথেকে বিস্তৃত একটি পোস্ট কেরিয়ার কোর্স রয়েছে।

একাকিত্ব ও ডিপ্রেশন: ভারতের নতুন মহামারী
  • ২৫ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: স্ট্যানফোর্ড, হার্ভার্ড এবং নোতরদাম। আমেরিকায় এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সবথেকে বিস্তৃত একটি পোস্ট কেরিয়ার কোর্স রয়েছে। অন্যান্য শহর এবং বিভিন্ন দেশেও এই একই ধরনের ইনস্টিটিউট তৈরি হয়ে চলেছে ক্রমাগত। এর নাম ডিসটিংগুইশড কেরিয়ার ইনস্টিটিউট। এখানে কী শেখানো হয়? অবসরের পর কোন ব্যক্তি কীভাবে নতুন অথবা পুরনো কাজেই নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারবে। বেসরকারি সংস্থায় ৫৫ অথবা ৫৮ কিংবা ৬০ বছর বয়সে অবসর নিয়ে নিতে হয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর লাইফস্টাইল ও জীবনের বৈশিষ্ট্য অনেক বদলে গিয়েছে। যে ব্যক্তি ৫৫ বছর বয়সে অবসর নিয়ে ফেলছে, তার শারীরিক সক্ষমতা ও এনার্জিতে নিশ্চিত টান পড়ে। কিন্তু তার মধ্যে কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের নৈপুণ্য রয়েই যায়। আশপাশে ৬০ অথবা ৬৫ বছর বয়সিদের যখন দেখা যায়, তখন বহু ক্ষেত্রেই মনেই হয় না যে, ওই মানুষটি অবসরযোগ্য।  

Advertisement

আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুযায়ী একবিংশ শতকের মানুষ সবথেকে বেশি ভয় পায় দুটি বস্তুকে। অবসর এবং মৃত্যু। কেন? অবসরের আতঙ্ক কেন? ওই সমীক্ষা বলছে, আজ আমি গুরুত্বপূর্ণ, কাল আমি গুরুত্বহীন হয়ে যাব অথবা গিয়েছি, এই আতঙ্ক কর্মজগৎ-কে গ্রাস করছে। সকলেই যে কর্মদক্ষ থাকে তেমন নয়। কিন্তু যারা মনে ও নৈপুণ্যে দক্ষতা বজায় রাখতে পারে, তাদের সঙ্কট অনেক বেশি। বিদেশে এই অবসরের পরবর্তী জীবনকে বলা হচ্ছে দ্য থার্ড চ্যাপ্টার। আর একটি নাম হল, অ্যাডাল্টহুড টু। এই ধরনের পোস্ট কেরিয়ার কোর্সের প্রয়োজন হচ্ছে কেন দেশে বিদেশে? কারণ অবসরের পর আমি দক্ষ, অথচ আমার কাজ নেই অথবা আমি দেশ, সমাজ কিংবা পরিবারের কাছে গুরুত্ব হারাচ্ছি, কাজে লাগছি না, এই মনোভাব ক্রমেই এক গোপন একাকিত্ব এবং ডিপ্রেশন নিয়ে আসছে।  
এইসব ইনস্টিটিউটে তাই অবসর পরবর্তীরা রীতিমতো পিঠের ব্যাকপ্যাকে খাতা পেন নিয়ে ক্লাস করছে এবং নোটস নিচ্ছে। তাদের এবার কী করা উচিত এবং কী  দক্ষতা কোনদিকে কাজে লাগানো যায়, সেটা জেনে আবার দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করছে। এই সমস্যাটি ভারতে হু হু করে বাড়ছে। ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ভারতে সবথেকে বেশি হারে যে নিছক ডায়াবেটিস বাড়ছে তা নয়। পাল্লা দিয়ে যা বাড়ছে, সেটি হল একাকিত্ব এবং ডিপ্রেশন।
মনে হতেই পারে ডিপ্রেশন এবং একাকিত্ব নিশ্চয়ই মধ্যবয়সি ও সিনিয়র সিটিজেনদের বেশি হচ্ছে। ভ্রান্ত ধারণা। ভারতের সবথেকে ধনী রাজ্য তথা নগরী চন্ডীগড়ে এই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ৬২ শতাংশ টিনএজার একাকিত্ব ও ডিপ্রেশনের শিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ভারতের ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি নাগরিকদের ২৫ শতাংশ ডিপ্রেশনে ভুগছে। এছাড়াও ডিপ্রেশন বাড়ছে বাড়িতে থাকা মহিলাদের মধ্যেও। বছরের পর বছর যারা ঘরের মানুষদের সময়মতো খাইয়ে, সংসার গুছিয়ে রাখল, তাদের জীবনের অপরাহ্ণে যে ডিপ্রেশন, একাকিত্ব আসে তার খোঁজই বা কে রাখে! যাদের নাম দেওয়া হয় কখনও হাউসওয়াইফ, কখনও হোমমেকার।
যুব সম্প্রদায় নিশ্চয়ই তাহলে ডিপ্রেশন থেকে অনেকটা মুক্ত? তাদের তো এখন সোশ্যাল মিডিয়ার মতো আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ আছে। বিনোদন, মন ভোলানো, বন্ধু পাতানো, অনর্গল কথা বলার সুযোগ, ইত্যাদি যা চাইবে তাই পাবে। এতদিন ছিল ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট। এখন এসেছে জেমিনি, চ্যাট জিপিটি, গ্রক, ডিপসিক নামের একঝাঁক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। যেখানে সিরিয়াস কাজও করা যাবে। আবার অন্তহীন মজাও জোগাবে। তাহলে আর একা হওয়ার সুযোগ কোথায়? এখানেও ভুল হচ্ছে। কারণ ওই সমীক্ষায় এটাও বলা হয়েছে যে, ভারতের ২৮ শতাংশ যুবক যুবতী একাকিত্ব ও ডিপ্রেশনের শিকার। সেটা নানাবিধ কারণে। সমাজে কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব না পাওয়া। মনের মতো জীবিকা না পাওয়া। যতটা আশা করে কোনও কোর্সে ভর্তি হয়েছিল, সেই কোর্স ফি অনুপাতে প্লেসমেন্ট নগণ্য। সামান্য বেতন দিয়ে বছরের পর বছর চালাতে হচ্ছে। যা পরিবার, প্রেমিক প্রেমিকা, আত্মীয়স্বজন এবং আরও সফল বন্ধুবান্ধবদের সামনে তাদের ক্রমাগত লজ্জিত করে তুলছে। সুতরাং পরিণতি হচ্ছে, এরা ক্রমেই নিজের এক জগতে ঢুকে পড়ছে। সারাক্ষণ মোবাইল করছে বটে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সম্পূর্ণ একা হয়ে যাচ্ছে। আর তা‌রা ঩কোনও ফিজিক্যাল গেট টুগেদারে আগ্রহ পায় না। গেলেও কথা খুঁজে  পায় না। 
‘প্রিভিলেন্স অ্যান্ড কোরিলেটস অফ লোনলিনেস ইন ইন্ডিয়া: আ সিস্টেমেটিক রিভিউ’ নামক ভারতীয় সমীক্ষায় জানা যাচ্ছে, ভারতের ৪৫ বছরের বেশি অর্থাৎ মধ্যবয়সি নারীপুরুষদের মধ্যে যারা শহরবাসী, তাদের ৪৩ শতাংশই একাকিত্ব বোধ করছে। প্রবল গোপন ডিপ্রেশনে আক্রান্ত।   গোপন ডিপ্রেশন মানে কী? মানে হল, যে মানুষটি জানেই না যে, তার আসলে যা হয়েছে, সেটি হল ডিপ্রেশন। কেন তার সকাল থেকে মন খারাপ, কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে না, ‘আমাকে একটু একা থাকতে দাও’ বলে মনে হচ্ছে, তার সঠিক কারণ তারা আইডেন্টিফাই করতে পারছে না। কিন্তু এসবের পিছনে আছে ডিপ্রেশন এবং একাকিত্ব। সবথেকে বিপজ্জনক প্রবণতা এবং উপসর্গ হল, কেন মন খারাপ তা চিহ্নিত করতে না পারা। সমীক্ষকরা যাদের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের পক্ষ থেকে সবথেকে বেশি করে যে প্রশ্ন উঠে এসেছে সেটি হল, ‘আমার কি আদৌ কোনও গুরুত্ব আছে? ডু আ‌ই ম্যাটার?’ অর্থাৎ যারা অবসরপ্রাপ্ত কিংবা বৃদ্ধ বৃদ্ধা, তারা নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে যে, আমাদের আর বিশেষ গুরুত্ব নেই। আর তাদের ঠিক পূর্ববর্তী জেনারেশন, যারা এখনও কর্মজগতে রয়েছে, পরিবারের মূলস্রোতের অঙ্গ, সেই মধ্যবয়সিরাও ভাবতে শুরু করছে যে, ‘ডু আই ম্যাটার?’ এই প্রবণতা থেকেই জন্ম নিচ্ছে নিজেকে ভাসিয়ে রাখার আকুল প্রয়াস। আশঙ্কার নাম fomo।  ফিয়ার অফ মিসিং আউট।  
ভারত সরকারের ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ সার্ভের সমীক্ষায় সবথেকে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে কিশোরকিশোরীদের নিয়ে। ২০০৫ সালের আশপাশে যাদের জন্ম, সেই আলফা জেনারেশনের সঙ্গে তাদের পিতামাতার মনস্তত্ত্বের এক আলোকবর্ষ পার্থক্য। পূর্ববর্তী প্রজন্মদের তাদের পিতামাতারা তুলনামূলকভাবে আরও বেশি বুঝতে পারত। 
এই আলফা প্রজন্মের অভিভাবকরা সেটা পারছে না। সম্পূর্ণ ভিন্নগ্রহের মানসিকতা মনে হচ্ছে বহু 
ক্ষেত্রে। অন্যতম কারণ হল, এই প্রজন্ম ডিজিটাল লাইফ যাপন করে। যে কোনও প্রশ্ন, যে 
কোনও সংশয়, যে কোনও দুঃখ, যে কোনও আনন্দ, যে কোনও সুখ অথবা হতাশার সমাধান খোঁজা হয় ডিজিটালি। তাই রক্তমাংসের মানুষের তুলনায় ক্রমেই তারা বেশি বিশ্বাস করছে ডিজিটাল স্ক্রিনকে। 
১৯৪০ সালের আগে টিনএজার শব্দটি সেভাবে বহুল ব্যবহৃত হয়নি। ওই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন পৃথিবীতে ধীরে ধীরে এই ভাবনা বিশ্বে এল যে, শৈশব ও পরিণতবয়সের মাঝখানে একটি বাফার জোন আছে। তার নাম দেওয়া হল অ্যাডোলোসেন্ট। একবিংশ শতকে এই অ্যাডোলোসেন্টরা ক্রমেই প্রবল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। কারণ তারাই বর্তমান এবং ক্রমে ভবিষ্যতের পোটেনশিয়াল ক্রেতা। কর্পোরেটের কাছে টার্গেট অডিয়েন্স। 
বেশ কিছু বছর আগে থেকেই টিভি বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়, পিতা পুত্রকে বকাবকি করছে, কেন সে ইউটিলিটির বিল মেটায়নি। বারংবার বলা সত্ত্বেও। পুত্র হাসতে হাসতে এক নিমেষে ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে বিল পে করে জানায়, হয়ে গিয়েছে। পিতামাতা খুব আশ্চর্য হয়। অর্থাৎ কর্পোরেট জগৎ তখন থেকে বার্তা দেয় যে, টিনএজাররা আধুনিক যুগের নিয়ন্তা। তারাই সব জানে। ওল্ডার জেনারেশন পিছিয়ে পড়ছে। এই মনোভাব ওই টিনএজারদের মধ্যেও প্রবেশ করে অনেকাংশে। ডিজিটাল জ্ঞানকেই তারা মনে করতে শুরু করে প্রকৃত নলেজ। কিন্তু জীবনসংগ্রামে নামার পর তারা দেখতে পায়, উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র, জীবিকা, সংসার, পরিবার, প্রেম, সমাজে জীবনের নানাবিধ শেডস আছে। সকলের সঙ্গে সাযু঩জ্য রেখে চলা অসম্ভব কঠিন এক কাজ। হাতে মোবাইল থাকলে সব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। একাধিকবার ডিজিটাল সম্পর্ক ও সম্পর্কভঙ্গের হতাশা যুক্ত হয়। কেরিয়ারের পথও সহজ নয়। সব মিলিয়ে তারা ক্রমেই একা হয়ে যায় মনের দিক থেকে। জন্ম নেয় ডিপ্রেশন। 
ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ  সার্ভে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিংবা ইউনিসেফ সকলেই মনে করছে সব বয়সি মানুষের মধ্যে ক্রমেই দেশজুড়ে বাড়ছে ডিপ্রেশন ও একাকিত্বের অসুখ। তাই এখনই সরকার ও সমাজকে সমস্যার সমাধানে দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি কোনও স্কিম নিতে হবে। সমাজ প্রশ্ন করুক সহনাগরিককে যে, কী হয়েছে তোমার? কারণ বল। বহু নীরব নাগরিকের মনের গোপন সুর হল, ‘আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ!’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ