পি চিদম্বরম: গত ১০ জুলাই জগদীপ ধনকর সানন্দে ঘোষণা করেছিলেন, ‘ভগবান সহায় হলে আমি যথাসময়েই, অর্থাৎ ২০২৭ সালের আগস্টে অবসর নেব।’ তিনি ছিলেন ভারতের উপরাষ্ট্রপতি এবং পদাধিকারবলে রাজ্যসভার চেয়ারম্যান। গত ২১ জুলাই ধনকর চুপচাপ উপরাষ্ট্রপতির পদে ইস্তফা দেন এবং ফলস্বরূপ রাজ্যসভার চেয়ারম্যান পদ থেকেও তাঁকে সরে যেতে হয়।
যেসব জিনিস জীবনকে রহস্যময় করে তোলে, সেগুলিই ঘটেছিল ১০ থেকে ২১ জুলাইয়ের মধ্যে। ২১ জুলাই, সোমবার সংসদের উভয় কক্ষের অধিবেশন ‘স্বাভাবিকভাবেই’ শুরু হয়েছিল। তার আগের দিন, সরকার সব রাজনৈতিক দলের ফ্লোর লিডারদের একটি প্রথাগত বৈঠক আহ্বান করেছিল। সরকার এবং বিরোধী দলগুলি একে অন্যকে ‘সমস্ত বিষয়ে’ বিতর্ক এবং সহযোগিতার প্রথাগত আশ্বাস দিয়েছিল। কোনও জরুরি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর সংসদ কখন এবং কীভাবে বিতর্ক সম্পন্ন করতে পারে বর্তমানে ভারতীয় সংসদের কার্যক্রমে ট্রেজারি বেঞ্চ (সরকার পক্ষ) এবং বিরোধী দলের মধ্যে তা নিয়ে কোনও ঐকমত্য নেই। এ এক অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।
বিতর্কের মূল বিষয়
রাজ্যসভায় বিরোধী পক্ষ সাধারণত ২৬৭ বিধির অধীনে বিতর্কের উপর গুরুত্ব দেয়। তালিকাভুক্ত বিষয়গুলি স্থগিত রেখে কোনও জরুরি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আশু উত্থাপনের জন্য একটি সংসদীয় কৌশল গ্রহণের সুযোগ দেয় বিধি ২৬৭। এই প্রস্তাবকে ‘অ্যাডজর্নমেন্ট মোশান’ (স্থগিত প্রস্তাব) বলা হয়। বিধি ২৬৭ প্রয়োগের মধ্যে খারাপ কিছু নেই। তবে, এনডিএ বিধি ২৬৭-এর অধীনে বিতর্ককে সরকারের ‘নিন্দা’র সমতুল্য বলে মনে করে। (সম্ভবত, অতীতেরও কিছু সরকার অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেছে)। এগারো বছরের বেশি ক্ষমতাসীন মোদি সরকার। এই আমলে বিধি ২৬৭-এর অধীনে একটিমাত্র প্রস্তাবের উপর আলোচনার অনুমতি মিলেছিল—‘বিমুদ্রাকরণ’ সম্পর্কিত। সেটি ২০১৬ সালের নভেম্বরের ঘটনা। রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্বগ্রহণের পর থেকে জগদীপ ধনকর বিধি ২৬৭-এর অধীনে কোনও বিতর্কের অনুমতি দেননি।
২১ জুলাই দিনটি এর ব্যতিক্রম ছিল না, এবং যা ঘটেছিল তা সরাসরি জগদীপ ধনকরের ‘প্লেবুক’ মেনেই। পহেলগাঁও সন্ত্রাসবাদী হামলা এবং ‘অপারেশন সিন্দুর’ নিয়ে আলোচনা করার দাবিতে বিজেপির মাত্র একজন সদস্য বিধি ১৬৭-এর অধীনে একটি নোটিস দেন। একই বিষয়ে বিধি ২৬৭-এর অধীনে নোটিস দেন বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য। চেয়ারম্যান বিজেপি সদস্যের প্রস্তাবটিকে ‘নো-ডে-ইয়েট-নেমড মোশান’ হিসেবে গ্রহণ করেন। অপরদিকে, অন্য প্রস্তাবগুলি বহুচর্চিত এবং বিধি ও নির্ধারিত পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় উল্লেখসহ প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। এরপর যথারীতি শুরু হয় হট্টগোল। (উল্লেখ্য, বিধি ২৬৭-এর অধীনে ‘নিয়ম ও নির্ধারিত পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ’ একটি প্রস্তাবের খসড়া কীভাবে লিখতে হয় সে সম্পর্কে কাউকেই অবগত করা হয়নি)।
বিদায়, সংবর্ধনা ছাড়াই
বেলা সাড়ে ১২টায় রাজ্যসভার চেয়ারম্যান কার্য উপদেষ্টা কমিটির (বিএসি) একটি বৈঠক ডাকেন। সেখানে সরকারের তরফে প্রতিনিধিত্ব করেন জে পি নাড্ডা এবং কিরেন রিজিজু। কিছু আলোচনার পর বিকেল সাড়ে ৪টায় বৈঠক স্থগিত করা হয়। কার্য উপদেষ্টা কমিটি বৈঠকটি যখন ফের ডাকল তখন ওই দুই মন্ত্রী ‘অনুপস্থিত’ রইলেন। স্পষ্টতই ক্ষুব্ধ হয়ে চেয়ারম্যান সভাটি স্থগিতই করে দেন। ‘মেডিক্যাল অ্যাডভাইস’-এর উল্লেখসহ ওইদিনই রাত ৯টা ২৫ মিনিটে তিনি পদত্যাগ করেন!
লক্ষণীয় বিষয় এই যে, পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করার জন্য কোনও দল বা সাংসদ জগদীপ ধনকরকে কিন্তু অনুরোধ করেননি। ২২ জুলাই, সংসদ কক্ষে ডেপুটি চেয়ারম্যান সংক্ষেপে এবং নিতান্ত দায়সারাভাবে উপরাষ্ট্রপতি পদের আচমকা ‘শূন্যতার’ ব্যাপারটি ঘোষণা করেন। স্পষ্ট হয়ে গেল যে, কোনও হট্টগোল বা ধুমধাম বা বিদায় সংবর্ধনা ছাড়াই ধনকরকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে।
বিজেপির অকৃতজ্ঞতা
জগদীপ ধনকরের কাছে এনডিএ সরকার অনেকভাবেই ঋণী। আমেরিকান ফুটবলের ভাষায়, তিনি ‘ট্যাকল’-এর ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ‘ওয়ান নেশন ওয়ান ইলেকশন’ বা ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’—সংক্ষেপে ‘ওএনওই’ এবং সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দদুটি বাদ দেওয়ার ব্যাপারে আরএসএস/বিজেপির যে অবস্থান, তারই পক্ষে ওকালতি করেছিলেন ধনকর। একটি মামলার (কেশবানন্দ ভারতী) রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ‘বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন’ বা ‘মৌলিক কাঠামোর মতবাদ’কে তুলে ধরেছে। জগদীপ ধনকর এজন্য শীর্ষ আদালতের সমালোচনা করেছিলেন। সংসদে পাস হয়েছে যে আইনের বিচার সংক্রান্ত পর্যালোচনার তত্ত্ব (দ্য থিয়োরি অফ জুডিশিয়াল রিভিউ অফ ল’জ), তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। সুপ্রিম কোর্টে এবং হাইকোর্টগুলিতে বিচারপতি নিয়োগে সরকারের অধিকারের উপর তিনি জোর দেন। একইসঙ্গে, এই ধরনের নিয়োগে বিচার বিভাগের প্রাধান্যের (দ্বিতীয় বিচারপতি মামলা) তত্ত্বকেও নস্যাৎ করেন তিনি। অন্যদিকে, ১৪২ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে রাজ্যপালদের (এবং রাষ্ট্রপতিকে) তিনমাসের মধ্যে বিলগুলিতে সম্মতি প্রদান বা প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য তিনি তীব্র সমালোচনা করেন। ধনকর ১০৫ অনুচ্ছেদের বিরোধিতাসহ, সদস্যদের ভাষণে উদ্ধৃত নথি বা তথ্যাদির প্রমাণ পেশ বা অথেনটিকেট করতে বলেন। তিনি ‘সনাতন ধর্ম’-এর পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। আরএসএস’কে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর অবস্থানে রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন ঘটেছিল এবং তাতে বিজেপির খুশি হওয়াই স্বাভাবিক ছিল।
জগদীপ ধনকর নানা সময়ে নানা দলে ছিলেন—জনতা দল, সমাজবাদী জনতা পার্টি (চন্দ্রশেখরের দল), কংগ্রেস এবং বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগ তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল। রাজ্য সরকারের সঙ্গে অযাচিত দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছিলেন ধনকর। তাতে তাঁর বিজেপি-ভাবাপন্ন ভাবমূর্তি ‘উজ্জ্বল’ হয়েছিল ঠিকই, একইসঙ্গে কলঙ্কিত হয়েছিল তাঁর রাজ্যপাল পদ। উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর উত্থান ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। দক্ষিণপন্থী পতাকা বহন করার জন্য আরএসএস/বিজেপি যে তাঁর প্রতি বিশেষ আস্থা রেখেছিল, তাঁর এই পদোন্নতি তারই প্রমাণ। তিনিই রাজ্যসভার প্রথম চেয়ারম্যান, যাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব (নো কনফিডেন্স মোশান) পর্যন্ত আনা হয়েছিল—তাঁর কার্যধারাই এজন্য দায়ী।
কোন ঘটনায় জগদীপ ধনকর এবং আরএসএস/বিজেপির মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ভেঙে গেল? বিচারপতি যশবন্ত ভার্মার বিরুদ্ধে ইমপিচেমন্ট প্রস্তাবের ধারণাটি গত ১৫ জুলাই কংগ্রেস সংসদীয় কৌশল গোষ্ঠীর (কংগ্রেস পার্লামেন্টারি স্ট্র্যাটেজি গ্রুপ) বৈঠকে অঙ্কুরিত হয়। ৬৩ জন বিরোধী সদস্যের স্বাক্ষরসংবলিত প্রস্তাবটি ২১ জুলাই গ্রহণ করা ছাড়া জগদীপ ধনকরের উপায় ছিল না (যদিও একই দিনে লোকসভায় সরকার পক্ষের তরফে একইরকম একটি প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিল)। এই প্রস্তাবটি, বিচারপতি শেখর যাদবের বিরুদ্ধে ইমপিচেমন্ট প্রস্তাবটি গ্রহণে জগদীপ ধনকরকে বাধ্য করেছিল, যা তিনি আটকে রেখেছিলেন সাতমাস যাবৎ। জল্পনা চলছে যে দুটি প্রস্তাবের উপর জগদীপ ধনকরের সিদ্ধান্ত ‘বোঝার উপর শাকের আঁটি’ হয়ে উঠেছিল। তবে এই ব্যাপারে আমি একমত নই। প্রস্তাব দুটি আদৌ তেমন গুরুতর কিছু নয়। পরিষ্কার এটাই যে, নেপথ্যে রয়েছে আরও অনেক কিছু।
জীবন একটি রহস্য, এবং কখনও কখনও কুৎসিত।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত