প্রাণকে পেতে হলে প্রাণকেই দরকার। সাধনা করতে হলেও দেহে প্রাণ থাকা আবশ্যক। তাঁর অভাবে তাঁকে পাওয়া যায় না। প্রাণের অভাবে প্রাণকে চিনতে পারা যায় না। প্রাণরূপী ঈশ্বর প্রাণকর্মরূপ সাধন সাপেক্ষ এবং অনুভূতিযোগ্য কিন্তু অনুমানযোগ্য নন্।
প্রাণকে পেতে হলে প্রাণকেই দরকার। সাধনা করতে হলেও দেহে প্রাণ থাকা আবশ্যক। তাঁর অভাবে তাঁকে পাওয়া যায় না। প্রাণের অভাবে প্রাণকে চিনতে পারা যায় না। প্রাণরূপী ঈশ্বর প্রাণকর্মরূপ সাধন সাপেক্ষ এবং অনুভূতিযোগ্য কিন্তু অনুমানযোগ্য নন্।
প্রাণকর্ম বা প্রাণায়ামের স্বরূপ সম্বন্ধে জ্ঞান থাকা আবশ্যক। উহা সদ্গুরুর নিকট শিক্ষালাভ করতে হয়। প্রাণায়ামে পূরক, রেচক ও কুম্ভক এই তিনটি কর্ম আছে। শ্বাস গ্রহণ করাকে পূরক, শ্বাস ত্যাগকে রেচক এবং পূরকের শেষে ও রেচকের আরম্ভে এবং রেচকের শেষে ও পূরকের আরম্ভে উভয়ভাগে যে স্থিতি তাকে কুম্ভক বলে। শ্বাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে আটকিয়ে রেখে যে কুম্ভক তা নিকৃষ্ট এবং সাধুদের পরিত্যাজ্য। ষট্চক্রপথে প্রাণ এবং অপান বায়ুর চালনাকালে উভয়প্রান্তে আপনা হতে যে স্থিতি তাই কুম্ভক। উহা শ্বাস-প্রশ্বাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে আটক করার মত কষ্টদায়ক নয়। নাক টিপে প্রাণায়ামও নয়।
অপানে জুহ্বতি প্রাণং প্রাণেঽপানং তথাপরে।
প্রাণাপানগতী রুদ্ধা প্রাণায়ামপরায়ণাঃ।
অপরে নিয়তাহারাঃ প্রাণান্ প্রাণেষু জুহ্বতি।।
অর্থাৎ কেহ কেহ প্রাণবায়ুকে অপান বায়ুতে এবং অপান বায়ুকে প্রাণবায়ুকে হোম করেন। এইরূপ করতে করতে ‘কেবল’ নামক কুম্ভকের দ্বারা প্রাণের ঊর্ধ্বাধোগতি স্বতঃ রোধ হওয়ায় প্রাণায়ামপরায়ণ হয়ে থাকেন। অপর কেহ কেহ উক্ত ‘কেবল-কুম্ভকের’ দ্বারা প্রাণ এবং অপান বায়ুর ঊর্ধ্বাধোগতি রহিত হওয়ার পর অর্থাৎ প্রাণায়ামপরায়ণ হয়ে ইন্দ্রিয়বৃত্তি সংযম করে প্রাণকে প্রাণেতেই হোম করেন।
এবং বহুবিধা যজ্ঞা বিততা ব্রহ্মণো মুখে।
উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্বদর্শিনঃ।।
অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞের মুখে এরূপ বহুবিধ যজ্ঞ বিহিত আছে। সেই জ্ঞানি তত্ত্বদর্শিগণ তোমাকে উপদেশ দেবেন। ভগবান্ পরিষ্কার করে বলেছেন এই আত্মতত্ত্ব সম্পূর্ণরূপে গুরুমুখী বিদ্যা, ইহা কোন গ্রন্থ হতে প্রাপ্ত হওয়া যায় না। কিন্তু প্রাণকর্মের বা আত্মকর্মের সার্থকতা, প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করতে হলে জীবের নিজ স্বরূপ সম্বন্ধে প্রথমে জ্ঞান থাকা আবশ্যক। মাতৃগর্ভে শিশু বাইরের বায়ু হতে শ্বাস-প্রশ্বাস না নিয়েই বেঁচে থাকে। তখন তার জিহ্বা ঊর্ধ্বমুখী থাকে এবং কূটস্থে আত্মরূপী ধ্রুবতারার প্রতি লক্ষ্য স্থির করে ধ্যানস্থ সমাহিত থাকে। সে তখন গর্ভসলিলে অবস্থান করে। জলকে নারা বলে, তাই ঐ শিশুই তখন নারায়ণ। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্র কেঁদে ওঠে। তখনই তার জিহ্বার বিচ্যুতি ঘটে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস যা এতক্ষণ সুষুম্নাপথে চালু ছিল তা বহির্গতি প্রাপ্ত হওয়ায় ইড়া-পিঙ্গলায় এসে পড়ে।
অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রাণময়ং জগৎ’ থেকে