শান্তনু দত্তগুপ্ত: বিজেপির অন্দরমহলে একটা ন্যারেটিভ ভীষণভাবে চলছে, মোদিজি নাকি এবার বাংলাটা দখল করেই ছাড়বেন। যেভাবে হোক। আর এই প্রচার (বা কলকাঠি) চলছে বুক ঠুকে। উপর থেকে নীচুতলা পর্যন্ত। ভারতের মতো একটা গণতান্ত্রিক দেশে তারপরও এই ন্যারেটিভকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে আমাদের মনে হচ্ছে না? কেন?
একটি দল, একজন ব্যক্তি এবং তাঁর হয়ে বাজনা বাজিয়ে চলা গোটা ইনস্টিটিউশন! তার মধ্যে আছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি, মিডিয়া, মায় নির্বাচন কমিশনও। আমরা ছুটছি, হয়রান হচ্ছি, মাথা কুটছি, তারপরও আমাদের মধ্যে কোনো হেলদোল নেই। এতকিছু দেখে-শুনে-সহ্য করেও বলছি, ‘এই তো জীবন কালীবাবু, পালটানো দরকার’! কেন?
সরকারের পরিচয় কী? উঁহু, দল নয়। একটি সরকারের পরিচয় তার কাজ। উন্নয়ন, প্রকল্প, চাকরি, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং অবশ্যই প্রতিশ্রুতি রক্ষা। ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বা আশ্বাস তারা রাখতে পারছে কি না। এক ভোট থেকে আর এক। মাঝের এই সময়টা তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সে যদি জাতীয় পার্টি হয়, তাহলে ইভিএমের সামনে দাঁড়ানোর আগে অন্য রাজ্যে শাসক হিসাবে ওই দলের মার্কশিট দেখাটাও দরকারি। প্রশ্ন হল, আমরা কি তা আদৌ দেখি? দেখলে কি অন্তত বিজেপির মতো পার্টির হয়ে দালালি করতাম?
খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই, দালালি শব্দটা আচম্বিতে ব্যবহৃত নয়। শুধু আক্রমণ করতে হবে বলেই... তেমনটাও নয়। এর নেপথ্যে যুক্তি-তক্কো এবং তথ্য সবই আছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, চোখের সামনে আছে বেশ কয়েকটি রাজ্য। আজ বাদে কাল ভোটযুদ্ধ হবে। তাই প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হওয়া খুব প্রয়োজন। এবং ওই রাজ্যগুলির অবস্থা জেনে নেওয়াটাও প্রয়োজন। ডবল ইঞ্জিন সরকার। এটাই গত ১০ বছর ধরে বিজেপির ক্যাচলাইন। কোমরে জড়ানো কার্তুজের বেল্ট দেখেছেন? ডবল ইঞ্জিন স্লোগানের সেই বেল্টের মধ্যে বসানো কার্তুজ হল ঘুসপেট, হিন্দু খতরে মে হ্যায়, নেহরু-কংগ্রেস দু’চক্ষের বিষ, পাকিস্তান মুর্দাবাদ...। লক্ষ করে দেখবেন, চারটি রাস্তা আর আটটি মন্দির ছাড়া বিজেপির গত ১২ বছরের শাসনে সেই অর্থে উন্নয়নের ধ্বজা খুঁজে পাওয়া যাবে না। মোদিজির ভাষায় ‘স্পেস টেকনোলজি’ দিয়ে তৈরি সেই রাস্তায় এক বৃষ্টিতে ধস নামে। রামমন্দির উদ্বোধনের পরও চুঁইয়ে জল ঢোকে। আর এইসব ঘিরে সার্বিক উন্নয়নের সংজ্ঞাটাই বদলে যায়। মূল্যবৃদ্ধি গা-সওয়া হয়। আর দেশের অর্থনীতি লাট খায়। কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি সরকারে এসেছিলেন ‘ডলারের দাম কেন ৬৪ টাকা’... এই প্রশ্ন তুলে। সঙ্গে দুর্নীতি, মনমোহন সিং সরকারের ‘অপদার্থতা’—এসব ইস্যুও ছিল। মোদিজি একের পর এক জনসভায় বলতেন, আমি ক্ষমতায় থাকলে এমনটা হতেই দিতাম না। মনমোহন সিং কেন পদত্যাগ করছেন না? ৬৪ টাকার থেকে ৯৫ টাকা বোধহয় মূল্যে কম হবে! তাই তিনি এখনও পদত্যাগ করছেন না। এটাই স্বাভাবিক বলে তিনি বোঝাচ্ছেন। আর আমরাও বুঝছি। ৪০০ টাকার গ্যাস হাজার টাকা হয়েছে। তিনি বোঝাচ্ছেন, ‘এটাই অনেক’। আমরাও মেনে নিচ্ছি ‘জি হুজুর’ বলে। তিনি বোঝালেন, দিল্লির আম আদমি পার্টির সরকার চোর। আবগারি দুর্নীতি করেছে। ধরো সবকটাকে। পুরে দাও জেলে। সিবিআই-ইডি তদন্ত করল। মণীশ সিশোদিয়া জেলে গেলেন। তারপর মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও। ভোট হল। হেরে গেলেন কেজরিওয়াল। তারপর দেখা গেল, আবগারি দুর্নীতি বলে কিছুই হয়নি! বেকসুর কেজরিওয়াল, সিশোদিয়া। মাঝখান থেকে ভোটটা হয়ে গেল। বিজেপি জিতেও গেল। কী বলব একে? গণতন্ত্র? প্রতিশ্রুতি ছিল তাদের, দূষণমুক্ত দিল্লি। কিন্তু হল কি? কেজরিওয়াল তাও জোড়-বিজোড় নীতির মতো কিছু একটা ভেবেছিলেন দূষণ কমানোর জন্য। খুব একটা ম্যানেজ করতে পারেননি। তাও ভেবেছিলেন। এখন দিল্লিতে বসেছেন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী—রেখা গুপ্তা। আগের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আইআইটি পাশ। আর এখনকার মুখ্যমন্ত্রী আমাদের শ্রদ্ধেয় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসকে বলেন সুভাষচন্দ্র প্যালেস। কেজরিওয়াল নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে মানুষের জন্য কিছু হলেও ভাবতেন। সিঙ্গল ইঞ্জিন হওয়া সত্ত্বেও একটা জায়গা পর্যন্ত বিদ্যুতের বিল ফ্রি করেছেন। কিন্তু রেখাজি এসব ভাবেন না। বরং বলা ভালো, এতকিছু ভাবনার সময় তাঁর নেই। ফোটোশ্যুট করে ফুরসত পেলে তো! এই চেয়ারে বসে ফাইল সইয়ের ছবি উঠছে। পরক্ষণেই বস্তি এলাকায় আটকে যাওয়া নালা দেখছেন ভুরু কুঁচকে। ছবি হয়ে গিয়েছে তো? ওতেই হবে। নিকাশি আটকেই রইল। তাঁর ছবি বেরিয়ে গেল কাগজে। যমুনা প্রতিদিন আরও একটু করে নরককুণ্ডে বদলে যাচ্ছে। ফেনায় এপার-ওপার উপচে যায়। জলের দেখা মেলে না উপর থেকে। আর দিল্লি সরকার কী করে? ৬ কোটি টাকা দিয়ে নৌকা কেনে। সেই নৌকায় চেপে বিশেষজ্ঞরা যমুনার বুকে দূষণ দেখবেন। বিজেপির ভোটের প্রতিশ্রুতি অবশ্য আরও ছিল। যেমন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের আদলে দিল্লির প্রত্যেক মহিলাকে আড়াই হাজার টাকা। ১৫ মাস কেটে যাওয়ার পর সেই টাকা কোনো মহিলা পেয়েছেন, এমন দুর্নাম কেউ রেখাজিকে দিতে পারবেন না।
আরও দু’টি রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। একটি হল মহারাষ্ট্র, অন্যটি হরিয়ানা। লোকসভা ভোটের যা ফল ছিল, তাতে এই দু’টিতে গেরুয়া পতাকা ওড়ানোর আশা কেউই করেনি। তাও তারা এসেছে। যাবতীয় সমীক্ষা এবং পাটিগণিতের মুখে চুনকালি লেপে এসেছে। প্রথমে দেখে নেওয়া যাক মহারাষ্ট্রের অবস্থা কী। দেশের বাণিজ্যিক রাজ্য। বাণিজ্যনগরী মুম্বই এখানকার রাজধানী। কিন্তু বিজেপির সাম্প্রতিক শাসনকালে এই রাজ্যের মাথাপিছু আর্থিক বৃদ্ধির হারে ধস নেমেছে। ২৯ বছর বয়স পর্যন্ত হিসাব কষলে বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। কৃষকদের আত্মহত্যা তো মহারাষ্ট্রে জলভাত। ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের জন্য লড়াই বিজেপি জমানায় আরও কঠিন হয়েছে। পেঁয়াজ চাষের ক্ষেত্র বলে পরিচিত এই ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে উৎপাদন খরচ কুইন্টাল পিছু ১৮০০ থেকে ২৫০০ টাকা। কিন্তু কৃষকরা কত টাকায় তা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন? ৮০০ থেকে হাজার টাকা প্রতি কুইন্টাল। দাবি ছিল, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য সাত হাজার টাকা করতে হবে। সেই দাবি এখন ৩ হাজার
টাকার আর্তিতে এসে নেমেছে। তারপরও ডবল ইঞ্জিন স্টার্ট নিচ্ছে না। একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ। এপস্টাইন ফাইল প্রকাশ মাত্রই অজিত পাওয়ারের ‘আমি অনেক কিছু জানি’ মন্তব্য এবং দুর্ঘটনায় মৃত্যু। তাও আমরা ভাবব না? দেশের অন্য প্রান্তে ব্যাগেজ কিন্তু বাড়ছে বিজেপির। প্রতিশ্রুতির অশ্বডিম্ব
প্রসবের ব্যাগেজ নয়! ওটা আর এদেশের মানুষ ধর্তব্যে আনে না। কিন্তু বেকারত্ব, আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার শীতঘুমে যাওয়া, বাড়তে থাকা দুর্নীতি, কৃষকদের হাহাকার... তালিকা দীর্ঘ। সবচেয়ে বড়ো কথা, হরিয়ানার সঙ্গে আজকাল বিস্তর মিল পাওয়া যাচ্ছে এই মহারাষ্ট্রের? না না, ধনী-গরিব প্রশ্নে নয়! ধনীর সংখ্যায় মুম্বই নগরী চিরকাল বিশ্বের বহু হাইফাই শহরকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। প্রতি বছর এখানে বিলিওনিয়রের সংখ্যা বাড়ছে। তার একশো গুণ সংখ্যায় গরিবও। তবে হ্যাঁ, হরিয়ানার সঙ্গে দারুণভাবে মিলমিশ খাচ্ছে কৃষকদের পরিস্থিতি। সেই ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিয়ে লড়াই, হাহাকার, দুর্নীতি। বিজেপির শাসনে হরিয়ানায় বেকারত্ব বেড়েছে ১৮৭ শতাংশ। প্রথম ১০০’র মধ্যে আর হরিয়ানার কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। দেড় হাজারের উপর কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ভারতীয় সেনায় হরিয়ানার প্রতিনিধিত্ব চোখে পড়ার মতো। আর তাই অগ্নিবীরের নামে ধ্যাষ্টামো বিপুল ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে এই রাজ্যে। জানতে ইচ্ছে হয়, এইসব রাজ্যের চার্জশিট কেন হয় না? কেউ কেন এগিয়ে আসে না? তারপরও কেন আমরা ‘পালটানো দরকার’ স্লোগানেই মধু ছড়িয়ে চলেছি?
এই পৃথিবীতে পরিবর্তনই যে একমাত্র স্থিতিশীল, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। মানুষ বদলায়, সময়, প্রযুক্তি, পরিস্থিতি... কিন্তু সরকার? আমাদের ভাবতে হয়, বিকল্পটা কী। চায়ের দোকানে যে ছেলেটি কাজ করে, সে অবশ্যই পড়াশোনা করে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সিইও হতে চায়। সেটা তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু সিইওর কাজে বড্ড চাপ, তাই এবার থেকে চায়ের দোকানে বাসন ধোবো... এটা কারও স্বপ্ন হতে পারে না। প্রতি ১০ জনে একজন ভোটার বাংলায় বাদ যেতে চলেছে। যাক। ইরানের যুদ্ধে সাড়ে তিন হাজার মার্কিন সেনা নামছে, আর বাংলার ভোটে আড়াই লক্ষ আধাসেনা। নামুক। ন্যারেটিভ বাড়ছে। সেটাও বাড়ুক। কিন্তু একটা কথা সত্যি—ন্যারেটিভ যতই সামনে আসুক, মানুষ যদি ভোট দিতে পারে, তাহলে তারা অনিশ্চয়তা, বিভাজন এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের স্বপ্ন দেখবে না। আর হ্যাঁ, আর একটা দৃশ্যও এই মুহূর্তে সত্যি। পুরুলিয়া-বাঁকুড়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় জনস্রোত। যাঁরা অতীতে ভোট প্রচার দেখেছেন, তাঁরা জানেন... জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত এলাকায় খুব ভিড় কোনো কালেই হয় না। ২০২১ সালে তৃণমূলের ২০০ পারের সমীকরণেও হয়নি। এবার হচ্ছে। কারণ, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্পের সুবিধা তাঁরা হাতেনাতে পেয়েছেন। এই প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনধারা বদলে গিয়েছে। ট্রেন ভাড়া করে এই ভিড়কে আনতে হয়নি। তারা নিজেরাই এসেছে। কৃতজ্ঞতা জানাতে। প্রতিশ্রুতি রক্ষার কৃতজ্ঞতা। স্বপ্ন পূরণের কৃতজ্ঞতা।