নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: আজ থেকে এক দশক আগের কথা। ২০১৫ সালের জুন মাস। পুরুলিয়ার কোটশিলা বনাঞ্চলের টাটুয়ারায় গ্রামে ঢুকে পড়েছিল একটা পূর্ণবয়স্ক চিতাবাঘ। আতঙ্কে গ্রামবাসীরা মিলে পিটিয়ে খুন করেছিল চিতাটিকে। তারপর সেটিকে মেরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল গাছের ডালে। কেটে নেওয়া হয়েছিল পা। খুবলে নেওয়া হয়েছিল নখ। নৃশংসতার ছবি দেখে শিউরে উঠেছিল গোটা দেশ। সেই কোটশিলা বনাঞ্চলেই সিমনি বিটের জঙ্গলে এবার বনদপ্তরের পাতা ট্র্যাপ ক্যামেরায় ধরা পড়ল চিতাদের খুনসুটির ছবি। ছবিটি চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের হলেও, বর্তমানে তা ভাইরাল।
টাটুয়ারা থেকে অবশ্য বনদপ্তর শিক্ষা নিয়েছে। বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করার পাশাপাশি বন্যপ্রাণ রক্ষায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাতা হয়েছে ট্র্যাপ ক্যামেরা। বন্যপ্রাণ রক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেব্যাপারে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো হয়েছে। বনদপ্তরের কর্তারা হাতেনাতে তার ফলও পেয়েছেন। পুরুলিয়ার ডিএফও অঞ্জন গুহ বলেন, বছর তিনেক আগে ওই এলাকায় কিছু পায়ের ছাপ দেখে আমাদের মনে হয়েছিল এলাকায় চিতাবাঘ রয়েছে। পরে চিতার ব্যাপারে নিশ্চিত হই। বর্তমানে দু’টি পূর্ণবয়স্ক চিতাবাঘ(পুরুষ ও স্ত্রী) এবং তাদের একজোড়া বাচ্চা রয়েছে। শাবক দু’টি বর্তমানে পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পথে। সেইসঙ্গে আমরা আরও একটি নতুন পায়ের ছাপ পাচ্ছি। অর্থাৎ, সবমিলিয়ে মোট পাঁচটি চিতার অস্তিত্ব মিলেছে। তবে, নতুন পায়ের ছাপটি পুরুষ নাকি মহিলা চিতার, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আশা করছি, শীঘ্রই এব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারব।
প্রসঙ্গত, ২০২২ সালে কোটশিলার সিমনি, হরতান, তহদ্রি, জাবর ও কড়িয়রের জঙ্গল লাগোয়া এলাকা থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছিল গ্রামবাসীদের গরু, ছাগল, ভেড়া। জঙ্গলে পাতা কুড়োতে গিয়ে স্থানীয়দের অনেকে গরু-ছাগলের হাড় ও কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁরা অনুমান করতে থাকেন, জঙ্গলে কোনও হিংস্র প্রাণী রয়েছে। বিষয়টি নজরে এলে দপ্তরের তরফে ওই এলাকায় ট্র্যাপ ক্যামেরা বসানো হয়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্র্যাপ ক্যামেরায় পূর্ণবয়স্ক চিতাবাঘের ছবি ধরা পরে। বনদপ্তরের কর্তারা জানতে পারেন, জঙ্গলে মোট দু’টি চিতাবাঘ রয়েছে। একটি পুরুষ এবং অন্যটি স্ত্রী। ওই বছরের বর্ষায় তারা দু’টি শাবকের জন্ম দেয়। আগে কোটশিলার বনাঞ্চলে চিতা ‘পরিযায়ী’ হলেও, বর্তমানে তারা স্থায়ী বাসিন্দা বলেই দাবি বনদপ্তরের। ডিএফওর দাবি, বাঘেরা বুঝতে পারে যে তারা যেখানে যাচ্ছে, সেই জায়গাটা নিরাপদ কি না। এই জঙ্গল নিশ্চয় তাদের নিরাপদ মনে হয়েছে। তাই থেকে গিয়েছে। জঙ্গলে খাবারের অভাব নেই। তবে, পুরুলিয়ায় যেভাবে বাঘের আনাগোনা বাড়ছে, তাতে অত্যন্ত আশাবাদী বনদপ্তরের কর্তারা। ডিএফও বলেন, আগামী পাঁচ বছরে পুরুলিয়ায় বাঘের নিয়মিত ‘মুভমেন্ট’ বুঝতে পারা যাবে।
তবে, শুধু চিতাই নয়, কোটশিলার জঙ্গলে আরও বহু লুপ্তপ্রায় জন্তুর ছবি তুলেছে ট্র্যাপ ক্যামেরা। এই জঙ্গলে হ্যানি ব্যাজর, স্লথ বিয়ার, বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ থেকে বহু বন্যপ্রাণীর অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে প্রায়শই।