


ভারতের ইতিহাস ও পুরাণে দত্তক সন্তানদের সাফল্য ও ভূমিকার কথা প্রায় কারও অজানা নয়। পুরাণে শ্রীকৃষ্ণ থেকে শুরু করে ইতিহাসে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর সকলেই ছিলেন দত্তক সন্তান। আবার বিপ্লব ও রাজনীতির অন্যতম প্রধান নাম নেলসন ম্যান্ডেলাও বড়ো হয়েছেন পালক পিতা-মাতার কাছে। তবে এই সমাজ একটা সময় পর্যন্ত দত্তক নেওয়ার প্রসঙ্গে এত দরাজ ও উদার ছিল না। ‘নিজের রক্তের নয়’ এই আপ্তবাক্য গুরুত্ব পেত। তবে দিনকাল বদলেছে। এখন বহু নিঃসন্তান দম্পতি দত্তক নেওয়ার পথে হাঁটছেন। রক্তের চেয়েও আপন হয়ে উঠছে আত্মীয়তা ও ভালোবাসা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার নিজ সন্তান থাকার পরেও অন্য এক সন্তানকে দত্তক নিতে চাইছেন। যদিও সমাজের সর্বস্তরে এখনও দত্তক নিয়ে ‘ছুঁতমার্গ’ মুছে যায়নি। একশ্রেণির মানুষ এখনও দত্তক সন্তান বিষয়টি সহজে মেনে নিতে পারেন না। নিজের পরিবারের মধ্যে কেউ কোনো শিশুকে দত্তক নিলে সেই শিশুকে ‘আপন’ করে নেওয়ার মানসিকতা থাকে না। তবে আশার কথা, এসব হীন মানসিকতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে ভারতের যুবসমাজ দত্তক নেওয়ার প্রবণতাকে গত দুই বছরে অনেকটা বাড়িয়ে তুলেছে। সেন্ট্রাল অ্যাডপটেশন রিসোর্স অথরিটি (কারা)-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৫ অর্থবর্ষে ভারতে সন্তান দত্তক নেওয়ার হার সর্বাধিক।
দত্তক কেন প্রয়োজন
সমাজের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে দত্তক নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একটি সন্তান দত্তক নিলে নিঃসন্তান বাবা-মা যেমন সন্তানসুখ পান, তেমনই শিশুটিও একটি সুন্দর পরিবার ও সুচারুভাবে প্রতিপালিত হওয়ার সুযোগ পায়। সামাজিক বৈষম্য সরিয়ে ফেলার পথে কিছুটা ভূমিকাও রাখা যায়। মমত্ব ও ভালোবাসার অভিধানে যে আর অন্য কোনো শর্ত বড়ো হতে পারে না, সে বার্তাও দেওয়া যায় সমাজকে। পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক দশকে অনেক দম্পতিই বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় অর্থ ও সময় ব্যয় না করে দত্তক নেওয়ার পথে হেঁটেছেন।
তবে চাইলেই দত্তক নেওয়া যায় না। তার জন্য কিছু নিয়মবিধি রয়েছে। দত্তক আইনও বেশ বড়ো। শিশুর সুরক্ষাই সেখানে প্রধান। শিশুকে দত্তক নেওয়ার পর তার প্রতি দুর্ব্যবহার ও তাকে কেন্দ্র করে অপরাধচক্র চালানো ইত্যাদি নানা চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করতেই দত্তক আইন বেশ কড়া। দত্তক নেওয়ার ব্যবস্থাও সেই আইননির্দিষ্ট পথেই চলে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই আইন পুনঃপর্যালোচনা চলতেই থাকে। তাই ঘন ঘন সংশোধনী আইন আসে।
আইন করে দত্তক কেন
সিংহভাগ ক্ষেত্রেই দত্তক সন্তান একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বড়ো হয়ে ওঠে। তাদের জীবন ভরে ওঠে মায়া-মমতা ও ভালোবাসায়। বেশিরভাগ শিশুই পালক মা-বাবার চোখের মণি হয়ে বড়ো হয়। তবে কিছু অমানবিক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তান দত্তকের কয়েক বছর পর অত্যাচার শুরু করেন পালক মা-বাবা। কেউ কেউ আবার বছর কয়েক পর দত্তক নেওয়া শিশুকে হোমে ফেরত পাঠাতে চান। মা-বাবার দায়িত্ব পালনে খামতি থেকে যায়। কেউ আবার তাদের বিনা বেতনের গৃহশ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করেন। কোনো দম্পতির পরবর্তীতে আত্মজ সন্তান জন্মালে দত্তক শিশুটির উপর নেমে আসে বৈষম্য ও অবহেলা। মারধর, যৌন নির্যাতনও বাদ যায় না। তার উপর রয়েছে নিয়ম না মেনে দত্তক দেওয়ার ঢল। দত্তক দেওয়ার নামে লাইলেসন্সহীন হোমগুলিতে শিশুদের দিয়ে অন্ধকার জগতের কাজ করানো, শিশু পাচার, অঙ্গবিক্রয়ের মতো গুরুতর অপরাধের নজিরও রয়েছে। তাই ভারতীয় আইনে দত্তক আইন খুব বিস্তৃত ও কঠোর।
দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়া
কোনো মিশন, হাসপাতাল বা রাস্তায় পড়ে থাকা শিশু সরাসরি দত্তক নেওয়া যায় না। একটা সময় টাকার বিনিময়ে শিশু দত্তক দেওয়া হত। এখন সেসব অতীত। ভারত সরকারের শিশু ও নারী কল্যাণ দপ্তরের অন্তর্গত ‘সেন্ট্রাল অ্যাডপশন রিসোর্স অথরিটি’(কারা)-র পোর্টালে গিয়ে আবেদন করা আইনসম্মতভাবে দত্তক নেওয়ার প্রথম ধাপ। আবেদনকারীর পরিচয়, সামাজিক অবস্থান, পরিবার, বাড়িঘর সব খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণের পর কারা-কর্মীরা বিবেচনা করেন শিশুটিকে বড়ো করে তুলতে আবেদনকারী সক্ষম কি না। তাঁদের মানসিক জোর, পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা, বাবা-মা হয়ে উঠতে তাঁরা কতটা প্রস্তুত সবই দেখা হয়। প্রয়োজনে পালক বাবা-মা সম্পর্কে পাড়া-প্রতিবেশী, অফিস বা এলাকাতেও খোঁজখবর নিতে পারে পারেন কারা-কর্মীরা তারপর সেই আবেদন মঞ্জুর হয়। তবে দেখা গিয়েছে, যাঁরা স্বাভাবিক মনন ও আন্তরিকতা থেকে শিশুকে দত্তক নিতে চান, তাঁদের ক্ষেত্রে এই আইনি খোঁজখবর কোনো সমস্যা তৈরি করে না। বরং প্রয়োজন পড়লে আবেদনকারীর পরিবারের কাউন্সেলিংও করানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
এরপর খোঁজখবর পর্ব মিটলে আবেদনকারীদের কাছে কয়েকটি দত্তকপ্রদানকারী বৈধ সংস্থার তথ্য ও শিশুর প্রোফাইল পাঠানো হয়। সেখান থেকে শিশু পছন্দের পর তার শারীরিক রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুটির সঙ্গে আবেদনকারী বাবা-মাকে সময় কাটাতেও দেওয়া হয়। সাধারণত শিশু পছন্দের জন্য তিনবার সুযোগ দেওয়া হয়। তার মধ্যে শিশু নির্বাচন না করলে আবার হোম সার্ভে থেকে প্রক্রিয়াটি শুরু করতে হয়। শিশু নির্বাচনের পর আইনি নথি তৈরি করে আদালতে জমা দিতে হয়। কোর্টে গিয়ে আধিকারিকের সামনে বসে হবু মা-বাবাকে একটি পিটিশনে সই করতে হয়। শুনানিও হয়। বিচারক কিছু প্রশ্ন করে মা-বাবার মানসিকতা সম্পর্কে বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি সন্তুষ্ট হলে দত্তক নেওয়ার ছাড়পত্র মেলে।
সন্তান দত্তক নেওয়ার যোগ্যতা
ভারতীয় নাগরিক, প্রবাসী ভারতীয় ও বিদেশিরাও ভারতীয় শিশু দত্তক নিতে পারেন। তবে সব ক্ষেত্রেই নিয়ম ভিন্ন। হবু মা-বাবার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাও এখানে বিচার্য। অবিবাহিত নারী বা পুরুষও ভারতীয় আইনে সন্তান দত্তক নিতে পারেন। তবে অবিবাহিত পুরুষ কোনো কন্যা সন্তান দত্তক নিতে পারবেন না। বিবাহিতরা বিয়ের দু’বছরের মধ্যে দত্তক নেওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন। কোনো দম্পতির তিনটি বা তার বেশি সন্তান থাকলে তাঁরা সাধারণত দত্তক নিতে পারেন না। তবে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশু, কারও সৎ সন্তানকে তাঁরা দত্তক নিতে পারেন। তবে সেটিও বিস্তারিত পর্যালোচনার পর।
বয়সের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম রয়েছে। আগ্রহী দম্পতির যে কোনো একজনের কিংবা একক অভিভাবক (সিঙ্গল পেরেন্ট) হলে তাঁর সঙ্গে শিশুর বয়সের ফারাক অন্তত ২৫ বছরের হতে হবে। দম্পতির মোট বয়সের যোগফল ১১০ বছরের কম ও একক অভিভাবকের বেলায় বয়স ৫৫ বছরের কম হতে হবে।
কেমন শিশু দত্তক
এককথায় যে শিশুর আইনি অভিভাবক নেই, অথবা যার বাবা-মা কিংবা অভিভাবক তার দেখভাল করতে পারছেন না, সেই শিশুকে অনাথ গণ্য করে দত্তক দেওয়া হয়। পরিবার পরিত্যক্ত শিশুকেও দত্তক নেওয়া যায়। আত্মীয়ের সন্তানকেও দত্তক নিতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে আত্মীয় জীবিত থাকলে তার আইনি অনুমতি প্রয়োজন। দত্তক নেওয়া শিশুর বয়স কয়েক মাস থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত হতে পারে। তবে শিশুর বয়স পাঁচ বছরের বেশি হলে তারও সম্মতি প্রয়োজন। দত্তকের চাহিদা বেশি। তাই গোটা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে মোটামুটি ১৮-২৪ মাস বা কয়েক বছর পর্যন্তও সময় লাগতে পারে।
দত্তক নেওয়ার পর
শিশুটি পরিবার পাওয়ার পরেও এজেন্সি আবেদনকারী পরিবারটির সঙ্গে দু’বছর যোগোযোগ রেখে চলে। পাড়া বা প্রয়োজনীয় জায়গায় খোঁজখবর চালায়। শিশুর বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, জীবনযাত্রা সম্পর্কিত সব রিপোর্ট আদালতে জমা করতে হয়। পালক অভিভাবক কোনো কারণে বাড়িবদল করলে সেটিও এজেন্সিকে জানাতে হবে। আদালতের রিপোর্টে সামান্যতম ত্রুটি ধরা পড়লেও আদালতের নির্দেশে দত্তক শিশুকে হারাতে পারেন অভিভাবকরা। পরবর্তীতে অভিভাবকরা আত্মজ সন্তান লাভ করলে সেটিও জানাতে হয় এজেন্সিকে। তখন দত্তক সন্তানটির অবহেলা হচ্ছে কি না সেদিক দেখার দায়িত্ব ফের এজেন্সি ও আদালতের।