পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: একুশের নির্বাচনে বাংলার মানুষ স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছিল, এ মাটি দাঙ্গা কিংবা বিভাজনের নয়-এ মাটি রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের আজন্মলালিত সম্প্রীতির। তবুও শিক্ষা নেয়নি গেরুয়া শিবির। ভোট দোরগোড়ায় আসতেই সিউড়ি বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে ফের শুরু হয়েছে হিন্দুত্বের সেই পুরনো জিগির। বাড়ি বাড়ি গীতা বিলি করে হিন্দুভোট এককাট্টা করার ‘ধর্মীয় অস্ত্র’ শানাচ্ছে বিজেপি, ঠিক তখনই সেই ‘ধর্মের নেশা’ ছাড়িয়ে মানুষকে রুটি-রুজির লড়াইয়ে ফেরাতে কোমর বেঁধে নেমেছেন সিপিএম প্রার্থী মতিউর রহমান। রামে যাওয়া বাম ভোট ফেরাতে মতিউরের এই ‘আদর্শগত’ যুদ্ধ বনাম বিজেপির ‘বিভাজনের’ রাজনীতি-সব মিলিয়ে সিউড়ির মাটি এখন এক চরম রাজনৈতিক সংঘাতের সাক্ষী।
বুধবার সিউড়ি বিধানসভার বারুইপুর গ্রামের অলিগলিতে গীতা বিলি করেন জগন্নাথ। গীতা বিলির সময় তাঁর মুখে উন্নয়নের বদলে শোনা গেল কেবলই ধর্মের কথা। ভোটারদের উদ্দেশে জগন্নাথকে সরাসরি বলতে শোনা যায়, ‘এ তো ধর্মযুদ্ধ! আর আমরা ধর্মের পক্ষেই আছি।’ এখানেই থেমে থাকেননি বিজেপি প্রার্থী। হিন্দুত্বের তাস খেলে তিনি আরও বলেন, ‘এই ভোট আসলে হিন্দুদের ভোট। হিন্দুদের আজ একজোট হয়ে বাঁচতে হবে। হিন্দুদের পক্ষে আপনাদের দাঁড়াতে হবে।’ রাজনৈতিক মহলের মতে, উন্নয়নের খতিয়ানে বিশেষ কিছু না থাকায় বিজেপি এখন সরাসরি ধর্মীয় আবেগকে উসকে দিয়ে হিন্দুভোট এককাট্টা করার কৌশলে নেমেছে। তবে কেবল গীতা বিলিতে যে চিঁড়ে ভিজবে না, তা আঁচ করেই প্রার্থীর সঙ্গে থাকা নেতারা ‘অন্নপূর্ণা প্রকল্প’ চালুর আশ্বাস দিচ্ছেন। ক্ষমতায় এলে মাসে তিন হাজার টাকা দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তাঁরা।
বিজেপির এই বিভাজনের রাজনীতির বিরূদ্ধে নিজেদের আদর্শকে সামনে রেখে সিউড়ির অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন লড়াকু বাম মুখ মতিউর রহমান। তাঁর লড়াইটা সবচেয়ে কঠিন। যাঁরা একসময় লাল পতাকা কাঁধে মিছিলে শামিল হতেন, কিন্তু আজ পদ্ম শিবিরে নাম লিখিয়েছেন, তাঁদের পুনরায় মূলস্রোতে ফেরানোর নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মতিউর। লাল পতাকার আবেগ উস্কে দিয়ে মতিউরের স্পষ্ট দাবি, ‘ধর্মের নেশায় বুঁদ করে মানুষের রুটি-রুজির আসল ইস্যু থেকে নজর ঘোরাচ্ছে বিজেপি। মানুষে মানুষে বিভেদ লাগিয়ে দিয়ে সেই আঁচে আসলে নিজেদের রাজনৈতিক রুটি সেঁকছে বিজেপি। সেই মরণফাঁদ থেকেই মানুষকে বের করে আনার লড়াই আমাদের।’ একসময়ের সিপিএম কর্মীদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে মতিউর বোঝাচ্ছেন-ধর্মের রাজনীতি আদতে মানুষকে ভাগ করার কৌশলমাত্র। এই দুর্নীতিপরায়ণ তৃণমূল সরকার এবং ধর্মীয় বিভাজনকারী বিজেপি- দুই দলকেই ছুঁড়ে ফেলতে হবে। তবেই সাধারণ মানুষের অধিকার ফিরবে।’শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় এসব ধর্মীয় মাতামাতিকে বিশেষ আমল দিতে নারাজ। তিনি হাঁটছেন উন্নয়নের চেনা রাস্তায়। বাড়ি বাড়ি প্রচারে গিয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধার খোঁজ নিচ্ছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনমুখী প্রকল্পগুলির খতিয়ান তুলে ধরছেন। সিউড়ির মাটিতে একদিকে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্বের স্লোগান, অন্যদিকে সিপিএমের আদর্শের লড়াই। তৃণমূলের দাবি উন্নয়নের। এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে সিউড়িবাসী শেষ পর্যন্ত কার উপর আস্থা রাখেন, এখন সেটাই দেখার।