সেই কবে মধুকবি লিখে গিয়েছেন ‘...একে একে নিভিছে দেউটি’। ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির দশাও তেমনই দাঁড়াতে চলেছে। একটা সময় পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও কেরালার মতো তিনটি রাজ্যে সিপিএমের নেতৃত্বে বামেদের সরকার ছিল। একটা সময় লোকসভায় বামেদের প্রতিনিধির সংখ্যা ছিল ৬০। সে সব এবার ইতিহাসের পাতায় চলে যেতে বসেছে। পশ্চিমবঙ্গে টানা ৩৪ বছরের রেকর্ড শাসনের পর ২০১১ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বাম সরকারের পতন ঘটে। তার সাত বছর পর, ২০১৮ সালে বামেদের আরেক দুর্গ ত্রিপুরায় মানিক সরকারের নেতৃত্বাধীন সরকার একটানা ২৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর পরাজিত হয়। এবার কফিনে শেষ পেরেকটা পড়তে চলেছে কেরালায়। সোমবার দক্ষিণী এই রাজ্যের ভোটের ফলাফলে স্পষ্ট ইঙ্গিত পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন এলডিএফকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে কুর্সি দখল করতে চলেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোট। স্বাধীন ভারতে ১৯৫৭ সালে বিশ্বে প্রথম কমিউনিস্ট সরকার গড়ে নজির তৈরি করেছিল কেরালা। তারপর গত কয়েকদশকে কখনো এলডিএফ, কখনো ইউডিএফ-এর হাত ধরে সরকার বদলের সাক্ষী থেকেছে কেরালা। সর্বশেষ ২০১৬ এবং ২০২১-এ পরপর দু’বার জিতে ক্ষমতা ধরে রেখেছিল এলডিএফ। শিবরাত্রির সেই সলতে এবার নিভতে বসেছে। কেরালায় বাম সরকারের পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, টানা দশ বছর ক্ষমতায় থাকায় প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া, সরকারের চরম আর্থিক সংকট, শীর্ষ নেতাদের ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ বাম সরকারের মৃত্যুঘণ্টা বাজার অন্যতম কারণ। সন্দেহ নেই পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরার পর কেরালাও হাতছাড়া হওয়ায় জাতীয় রাজনীতিতে বামেদের দর কষাকষির সুযোগ আরও কমল। এই ফলাফলে দেশে বাম আদর্শের অপমৃত্যু না ঘটলেও তারা যে আরও গভীর সংকটে পড়তে চলেছে, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।
সোমবার বিকেল পর্যন্ত পাঁচ রাজ্যের ভোটের ফলাফলের অনেকটাই সামনে এসেছে। এর মধ্যে অসমের ফলাফলে কোনো চমক নেই। মোট ১৪০ আসনের এই বিধানসভায় দুই তৃতীয়াংশ আসন দখল করে ফের কুর্সি দখল করছে বিজেপি। সেই রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, বিভাজন, অনুপ্রবেশের মতো যেসব জ্বলন্ত ইস্যুকে সামনে রেখে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখেছিল কংগ্রেস, ওই রাজ্যের মানুষের তাতে সায় যে মেলেনি, তা স্পষ্ট। বরং দেখা যাচ্ছে, গতবারের চেয়েও সেখানে কম আসন পেতে চলেছে রাহুল গান্ধীর দল। পাঁচ রাজ্যের মধ্যে অন্যতম ছিল কেন্দ্রশাসিত রাজ্য পুদুচেরি। মাত্র ৩০ আসন বিশিষ্ট এই ছোটো রাজ্যটিও এনডিএ জোটের হাতে ছিল। এবারেও তার ব্যতিক্রম ঘটল না। এই লেখা পর্যন্ত যে খবর পাওয়া গিয়েছে, পুদুচেরিতে পঞ্চমবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন এআইএনআরসি দলের প্রধান এন রঙ্গস্বামী। দেখার বিষয়, নতুন সরকারে বিজেপি কোনো উপমুখ্যমন্ত্রী পাবে কি না। এই দুই রাজ্যের ক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিতে কার্যত গোটা রাষ্ট্রশক্তিকে মাঠে নামিয়েছিল বিজেপি। বস্তুত পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে ঘিরে এবার নির্বাচন কমিশন যে ভূমিকা রেখেছে, তা ছিল নজিরবিহীন। প্রাথমিক ফলাফল বিশ্লেষণে তার প্রভাব স্পষ্ট।
তবে পাঁচ রাজ্যের ভোটে এই লেখা পর্যন্ত যেটুকু ফলাফল সামনে এসেছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো চমক বোধহয় তামিলনাড়ুর ফলাফল। দক্ষিণের এই রাজ্যে ডিএমকে বনাম এডিএমকে-র লড়াই দেখতেই অভ্যস্ত রাজ্য তথা গোটা দেশ। এবারের ভোটে বাড়তি আকর্ষণ ছিল দক্ষিণী সিনেমার সুপারস্টার বিজয় থালাপতি নতুন দল (টিভিকে) গড়ে ভোটে অংশগ্রহণ। ২৩৪ আসনের এই বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১১৭টি আসন। দেখা যাচ্ছে, বিজয়ের দলই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে যেতে চলেছে। শেষপর্যন্ত চূড়ান্ত ফলাফলে সেটাই সত্যি হলে তামিলনাড়ু বিজয় থালাপতি নতুন মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন। এ জন্য অবশ্য ডিএমকে বা এডিএমকে-এর মধ্যে কোনো একটি জোটের সমর্থন হয়তো পেতে হবে তাঁকে। শোনা যাচ্ছে, ভোটের ফলাফল আন্দাজ করে ডিএমকে ইতিমধ্যে বিজয়ের দলের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই রাজ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি অসন্তোষ, শহরাঞ্চলের শিক্ষিত সম্প্রদায়, যুব সমাজের সমর্থন পেয়েছে বিজয়ের দল। সঙ্গে ছিল তাঁর আকাশপ্রমাণ জনপ্রিয়তা। এসব মিলিয়েই তাই পোড়খাওয়া দুই দলের রাজনৈতিক শক্তি এবং যাবতীয় সমীক্ষাকে ভুল প্রমাণ করে দিতে সক্ষম হয়েছে টিভিকে। তবে বিজয় নতুন দল তৈরি করতেই তাঁর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে কাজে লাগিয়েছিল বিজেপি। এখন দেখার ডিএমকে না এডিএমকে-বিজেপি জোট—কার সমর্থন নেয় টিভিকে।