Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

হিন্দুত্ব ছেড়ে বহুত্ববাদ, দিশেহারা বঙ্গ বিজেপি!

‘হিন্দু হিন্দু ভাই ভাই’ স্লোগান কি তাহলে ফ্লপ? কালীগঞ্জ উপনির্বাচনের ফল দেখেই কি বঙ্গ বিজেপির এই ভোলবদল, নাকি সবটাই রাজনৈতিক কৌশল?

হিন্দুত্ব ছেড়ে বহুত্ববাদ, দিশেহারা বঙ্গ বিজেপি!
  • ১২ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ‘হিন্দু হিন্দু ভাই ভাই’ স্লোগান কি তাহলে ফ্লপ? কালীগঞ্জ উপনির্বাচনের ফল দেখেই কি বঙ্গ বিজেপির এই ভোলবদল, নাকি সবটাই রাজনৈতিক কৌশল? বিজেপির রাজ্য সভাপতি হিসেবে শমীক ভট্টাচার্যের প্রথম প্রকাশ্য ভাষণ এই সব প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। ‘বিজেপি মুসলিম বিরোধী নয়’ তাঁর দাবিতেই সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি। কড়া হিন্দুত্বের লাইন ছেড়ে আচমকা বহুত্ববাদের পক্ষে তাঁর সওয়ালে কোনও লাভ হবে না। কারণ আলকাতরার উপর যতই হোয়াইটওয়াশ করা হোক না কেন, সাদা হবে না। কথায় কথায় বাংলাদেশে ও পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি খেতে অভ্যস্ত মুসলিমরা বিজেপিতে কিছুতেই আস্থা রাখবে না। 

Advertisement

হিন্দুত্বই বিজেপির রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। একটা সময় অনেকে মনে করতেন, ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করে বাংলায় বিজেপি সাফল্য পাবে না। কিন্তু, পেয়েছে। সৌজন্যে বামেরা। তবে, বামেরা শক্তি ধরে রাখলে বিজেপির বাংলায় মাটি পাওয়া কঠিন ছিল। ২০১৬ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারাতে না পারায় হতাশাগ্রস্ত বাম নেতাকর্মীরা বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় পরিস্থিতি বদলে যায়। বিজেপিই বাংলায় হয়ে যায় প্রধান বিরোধী দল। তবে একুশের পর এ রাজ্যের ১১টি উপনির্বাচনেই বিজেপি হেরেছে। এমনকী, লোকসভাতেও তাদের সদস্য সংখ্যা ১৮ থেকে কমে হয়েছে ১২। গেরুয়া শিবিরে নেমে আসে হতাশা। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের পতন বঙ্গ বিজেপিকে কিছুটা হলেও অক্সিজেন জুগিয়েছে।
বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর হওয়া অত্যাচারের ঘটনাকে সামনে এনে বাংলাতে মেরুকরণের জন্য উঠেপড়ে লাগে বঙ্গ বিজেপি। স্লোগান তুলেছিল, হিন্দু হিন্দু ভাই ভাই। কিন্তু তাতে যে লাভ হয়নি, সেটা কালীগঞ্জ উপনির্বাচনে বিজেপি নেতারা বিলক্ষণ বুঝেছেন। অনেকে বলছেন, সেই কারণেই রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর শমীকবাবু বহুত্ববাদের বুলি আওড়েছেন। পাশাপাশি বামেদের সমর্থন চেয়েছেন। ভাবছেন, ছাব্বিশেও সিপিএম আত্মঘাতী গোল খেয়ে বিজেপিকে ফাইনাল ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দেবে। কিন্তু এখানে শমীকবাবুদের একটা ছোট্ট ভুল হচ্ছে। ২০১৯ ও ২০২১ সালের সঙ্গে ২০২৫ সালের তফাৎ অনেক।
কী সেই তফাৎ? উনিশ এবং একুশ সালে অধিকাংশ বাম কর্মী-সমর্থক মনে করেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরানোর ক্ষমতা একমাত্র বিজেপিরই আছে। তাই তাঁরা ঢেলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু, ‘অলআউট’ লড়াই করেও বিজেপি ক্ষমতার ধারেকাছে পৌঁছতে পারেনি। পাশাপাশি রয়েছে সিপিএমের ‘সেটিং তত্ত্ব’। সেই প্রচারে তৃণমূল বিরোধী ভোটারদের একাংশের মধ্যে গেরুয়া শিবিরের ভূমিকা নিয়ে কিছুটা হলেও বিভ্রান্তি আছে। বিশেষ করে রামে যাওয়া বাম ভোটারদের মধ্যে। তাতে বিক্ষিপ্তভাবে রামে যাওয়া বামের ভোট কিছুটা ফিরছে। এই পরিস্থিতিতে প্রয়াত জ্যোতি বসুর প্রতি শমীকবাবু শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। খুব ভালো কথা। কিন্তু তাতে বাম ভোটের অবশিষ্টটুকুতেও বিজেপি থাবা বসাবে, এমন ভাবাটা একটু বেশি রকমেরই বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।
একুশের নির্বাচন থেকেই বাংলায় সিপিএম তথা বামেরা শূন্য। লোকসভা নির্বাচনেও সিপিএম খাতা খুলতে পারেনি। ফলে ছাব্বিশের নির্বাচন বঙ্গ সিপিএমের কাছে অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন লড়াই। এটা আলিমুদ্দিনের ম্যানেজারেরা খুব ভালো করেই জানেন। সেইজন্যই তাঁরা শূন্যের গেরো টপকানোর মরিয়া চেষ্টা চালাবেন। ফলে তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির ব্যবধান সিপিএমের ভোটে ঘুচবে, এমনটা ভাবা অলীক কল্পনা।
মাস আষ্টেকের মধ্যেই বাংলার বিধানসভা নির্বাচন। এই অবস্থায় সুকান্ত মজুমদারকে সামনে রেখেই বিজেপি নির্বাচন করবে বলে অনেকে মনে করেছিলেন। কিন্তু, শেষপর্যন্ত পরিবর্তন হল এবং এমন একজনকে রাজ্য সভাপতি করা হল যিনি এক দশকেরও বেশি সময় সংগঠনের কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন না। একবার নির্বাচনে জিতেছেন। কিন্তু জয় লাভের ধারাবাহিকতা নেই। সবচেয়ে বড় কথা, ‘মাস লিডার’ বলতে যা বোঝায় শমীকবাবু তা নন। তবুও তাঁকেই রাজ্য সভাপতি করায় অনেকে মনে করছেন, তৃণমূল কংগ্রেস ফাঁকা মাঠে গোল করার সুযোগ পেয়ে গেল। 
বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য সভাপতির গুরুত্ব অসীম। বিধানসভা ভোটের প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজ্য সভাপতির মতামত বিশেষ গুরুত্ব পায়। সেই কারণে নিজের পছন্দের মানুষকে রাজ্য সভাপতি করার জন্য দাপুটে নেতারা মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু শিকে ছিঁড়েছে শমীকবাবুর কপালেই।
তবে, নতুন রাজ্য সভাপতির অভিষেকলগ্নে যা ঘটল তাতে এতদিন ধরে নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি নিয়ে চলা শমীকবাবু ডুবলেন সেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের পাঁকে। মুখে আদি-নব্যের মেলবন্ধনের কথা বললেও প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকেই আমন্ত্রণ জানালেন না। আমন্ত্রণ না জানানোর প্রকৃত কারণটা একমাত্র শমীকবাবুই বলতে পারবেন। তবে, এই ঘটনায় আদিরা বেশ মুষড়ে পড়েছেন। আদিরা ভেবেছিলেন, শমীক ভট্টাচার্য সভাপতি হওয়ায় তাঁরা ফের 
গুরুত্ব পাবেন। দলবদলুদের দাপট কমবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও ঈঙ্গিত পাওয়া 
যায়নি। উল্টে অভিষেক-মঞ্চে ডাক পেলেন না প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি। তাতে অক্সিজেন পেয়ে 
গেল দলবদলু শিবির।
ডুগডুগি বাজিয়ে দিলীপবাবু বিষয়টি হালকা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু, আরএসএস কর্তারা তাঁদের প্রাক্তন প্রচারকের এই অপমান মোটেই ভালোভাবে নেননি। শোনা যাচ্ছে, তাঁদের চাপেই প্রাক্তনকে ফোন করতে বাধ্য হন শমীকবাবু। সাইড লাইনের বাইরে থাকা দিলীপবাবু ‘ওয়ার্মআপ’ শুরু করতেই ঘাম ঝরতে শুরু করেছে বিরোধী গোষ্ঠীর। নির্বাচনের 
মুখে তিনি গুরুত্ব পেলে আদিরা অক্সিজেন পাবেন। চাপে পড়ে যাবেন দলবদলুরা। নতুন রাজ্য সভাপতিকে সামনে রেখে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে একচেটিয়া 
দাপট দেখানোর যে স্বপ্ন তাঁরা দেখেছিলেন, তা 
পূরণ হবে না। 
বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতিকে দিল্লি ডেকে পাঠানোর পিছনে কী কারণ থাকতে পারে, তা নিয়ে গেরুয়া শিবিরের দু’টি মত রয়েছে। কেউ বলছেন, বাংলায় বিজেপির যাবতীয় সাফল্য এসেছিল তাঁরই আমলে। ছাব্বিশের ভোটে তাঁকে প্রয়োজন আছে। 
সেটা দিল্লি বুঝেছে বলেই ডেকে পাঠিয়েছে। অপরপক্ষের বক্তব্য, দলের নির্দেশ অমান্য করে দীঘার জগন্নাথ মন্দিরে যাওয়ায় ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করায় দলকে যথেষ্ট বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। তাই তৃণমূলের সুবিধে হবে এমন কোনও কাজ ভবিষ্যতে যাতে না করেন তারজন্যই তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। আর এরপরেও বাড়াবাড়ি করলে বিশেষ কোনও দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে অন্য রাজ্যে। সেই বার্তা শোনানোর জন্যই দিল্লিতে তলব করা হয়েছিল।
শমীকবাবু রাজ্য সভাপতি হওয়ায় একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, দলবদলুদের বিজেপি ব্যবহার করবে, কিন্তু সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে আরএসএসের হাতে। এখনও পর্যন্ত বাংলায় যতজন রাজ্য সভাপতি হয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই আরএসএস ঘনিষ্ঠ। বাংলায় বিজেপির সংগঠনের যে হাঁড়ির হাল সেটা দিল্লির নেতারা জানেন। তাঁরা এও জানেন, বাংলায় বিজেপির পাওয়া সাফল্যের অনেকটা কৃতিত্বই আরএসএসের। নির্বাচন এলেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের প্রচারকরা কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। লোকসভা নির্বাচনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার তৃণমূলের ট্রাম্প কার্ড হবে, সেটা তাঁরা আগেই বুঝেছিলেন। তাই গ্রামের দুঃস্থদের বুঝিয়েছিলেন, ১০০০ টাকায় আজকাল কিছুই হয় না। দরকার স্থায়ী কাজ। রামমন্দির স্থাপন যে একটা বিরাট ব্যাপার, সেটাও তাঁরা বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। এভাবেই তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করেন। পাশাপাশি হিন্দুদের রক্ষা করতে গেলে বিজেপিকেই যে দরকার, সেটাও তাঁরা বোঝান।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শমীকবাবুকে রাজ্য সভাপতি করার পিছনে দিল্লির কী অঙ্ক থাকতে পারে? কবিতাপ্রেমী শমীক ভট্টাচার্য সম্পর্কে শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে একটা ভালো ধারণা আছে। একই সঙ্গে তিনি আরএসএস ঘরানার লোক। সেই হিসেবে তিনি অবশ্যই আদি। বঙ্গ বিজেপির তথাকথিত তিন গোষ্ঠীর কোনওটির সঙ্গেই তিনি সম্পৃক্ত নন। আবার কোনও গোষ্ঠীর সঙ্গে তেমন দ্বন্দ্বও নেই। দিল্লি হয়তো মনে করেছিল, মেলাবেন তিনি মেলাবেন। ‘ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো দরজাটা তিনি মেলাবেন।’ আদি ও নব্যের দ্বন্দ্ব তিনি মেটাবেন। তবে তাঁর অভিষেকলগ্নেই ঘটে গিয়েছে ছন্দপতন। তাই কিছুতেই দূর হচ্ছে না সংশয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ