হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, জম্মু ও কাশ্মীর, পাঞ্জাবের পর বাংলার ডুয়ার্স। লন্ডভন্ড পাহাড়-ডুয়ার্স। সঙ্গে বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত সিকিম এবং প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও ভুটান। সব মিলিয়ে চারদিকে শুধুই ধ্বংসের চিহ্ন। এক লহমায় ম্লান মলিন হয়ে গিয়েছে উৎসবের পরিবেশ। ভয়াবহ বিপর্যয়ের ধাক্কায় মিলিয়ে গিয়েছে বাসিন্দাদের মুখের হাসি। দুধিয়া-মিরিক, দার্জিলিংয়ের বিজনবাড়ি বা জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা, বানারহাট, গয়েরকাটা, ক্রান্তি—সবত্রই হাহাকার। বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। প্রবল বর্ষণ ও ধসের কারণে রবিবারই পাহাড় ও ডুয়ার্স মিলিয়ে ২৮ জনের প্রাণহানির খবর মিলেছিল। সোমবার নাগরাকাটার বামনডাঙা চা বাগানের মডেল ভিলেজ থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে আরও চারটি মৃতদেহ। এগুলি ধরলে ওই অঞ্চল থেকে মোট নয়টি মৃতদেহ উদ্ধার হল। পাশাপাশি, তোর্সা নদীতে ভেসে এসেছে আরও দুটি দেহ। কোচবিহারের পুন্ডিবাড়িতে উদ্ধার হওয়া দেহ দুটির পরিচয় ওইদিন পর্যন্ত অজ্ঞাতই ছিল। জলঢাকার স্রোতে কোচবিহারের মাথাভাঙা-১ ব্লকের জোড়শিমুলিও বিধ্বস্ত। সেখানে রবিবার পুকুর ও নদীতে তলিয়ে যাওয়া দুজনের দেহ সোমবার উদ্ধার হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন বালক এবং অন্যজন বৃদ্ধ। সব মিলিয়ে ডুয়ার্স এলাকায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬! আরও অনেকে নিখোঁজ বলে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে প্রশাসন সূত্রে। দার্জিলিংয়ের বিজনবাড়ি ও সিওক অঞ্চলে নিখোঁজ দুজন। নাগরাকাটার বামনডাঙাতেও বিপর্যয়ের পর থেকে বেশ কয়েকজনের হদিশ মিলছে না। স্বজন হারানোর হাহাকার সর্বত্র। জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে বহু বাড়িঘর, গবাদি পশু। ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।
তাঁদের ভরসা কেবলই সরকারি সহায়তা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্যের মা-মাটি-মানুষের সরকার সেই সহায়তা প্রদানেই এখন উদারহস্ত। শাসক দলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং মন্ত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পড়ে থেকেই এই কাজে প্রশংসনীয় তদারকি করে চলেছেন। আর তখনই সামনে এসেছে অবাঞ্ছিত এক রাজনৈতিক বিবাদ। দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নাম করে সোমবার কনভয় নিয়ে হাজির হয়েছিলেন বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু এবং বিধায়ক শংকর ঘোষ, সঙ্গে বিজেপির কিছু কর্মী-সমর্থকও। নগরাকাটার সুলকাপাড়ায় তাঁরা গাড়ি থেকে নামতেই ক্ষুব্ধ দুর্গত নরনারীরা তাঁদের ঘিরে ধরেন। কেন তাঁরা এত দেরিতে এবং কোথায় বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্ব—এই সংগত প্রশ্ন তুলে তাঁরা বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। দুর্গত মানুষজনকে সামনে রেখে কদর্য ফটোশ্যুটকে কেউই ভালো চোখে দেখেননি। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে এমএলএ-এপির দলবল যখন গাড়ি ঘুরিয়ে পাততাড়ি গোটাবার মতলবে ছিলেন অমনি তাঁদের উপর জনরোষ আছড়ে পড়ে। তাতে এমপি জখম হন এবং এমএলএর গাড়ির কাচ ভেঙে যায় বলে অভিযোগ। ক্ষোভের পারদ এমন চড়তে থাকে যে কেউ কেউ বিধায়ককে জুতো ছুড়ে মারতেও উদ্যত হয়। সরকারি নিরাপত্তারক্ষীদের তৎপরতায় অবশ্য বিজেপির লোকজন ওই যাত্রায় রক্ষা পান। সোমবার ডুয়ার্সসহ উত্তরবঙ্গের আরও একাধিক স্থানে বিজেপি নেতৃত্ব ক্ষুব্ধ মানুষের অপ্রিয় প্রশ্নাবলি এবং ক্ষোভের মুখে পড়েন।
বলা বাহুল্য, বাংলায় তুলনামূলকভাবে উত্তরেই বিজেপির প্রভাব কিছুটা বেশি। আর সেখানেই তাদের ‘জনপ্রিয়তার’ এই দশা দেখে ছাব্বিশের ভোটের আগে গেরুয়া শিবির যে বিরাট হতাশ তা অনুমেয়। কিন্তু এর দায় নিজেরা নেওয়ার পরিবর্তে তা সটান চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজ্যের শাসক দলের ঘাড়ে। তৃণমূল কংগ্রেসও যথারীতি দাবি করেছে, এর পিছনে তাদের কোনও ভূমিকা নেই। পরিতাপের বিষয় এই যে, এই আকচাআকচি রাজনীতির নীচের তলায় আর সীমাবদ্ধ নেই, তরজায় অংশগ্রহণ করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী! শুরুটা করেছেন নরেন্দ্র মোদিই। সোশ্যাল মিডিয়ায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং তৃণমূলকে বিঁধেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘তৃণমূলের উচিত, হিংসায় প্ররোচনা না দিয়ে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত নয়।’ এক্স-এ মুখ্যমন্ত্রীও পালটা লিখেছেন, ‘কোনও প্রমাণ ছাড়াই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে রাজনীতির রং লাগাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। এটা দুর্ভাগ্যজনক!’ যখন মানুষ বিপন্ন, এমনকী মরছেও তখন দেশের অভিভাবকদের এই ভূমিকা অনভিপ্রেত এবং কুরুচিকর। তাঁরা সংকীর্ণ রাজনৈতিক তরজায় মগ্ন হলে উদ্ধার, ত্রাণবণ্টন, পুনর্বাসনের মতো অত্যন্ত জরুরি প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। তাতে মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। প্রধানমন্ত্রীর উচিত, দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সর্বতোভাবে বাংলার দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আইলা এবং পরবর্তী প্রতিটি বিপর্যয়ে কিন্তু বাংলার মানুষ কেন্দ্রকে পাশে পায়নি। এবার অন্তত দিল্লি মানবিক মুখ নিয়ে এগিয়ে আসুক নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে। বঙ্গ বিজেপিরও উচিত, এই দাবিতে সোচ্চার হওয়া।