Bartaman Logo
৩০ মে, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

আলোর দেশ

২০২৫ সালের মে মাস, মনস্থ করলাম জাপান যাব বেড়াতে। কিন্তু কলকাতা থেকে জাপান সরাসরি বিমান যোগাযোগ নেই।

আলোর দেশ
  • ৩০ মে, ২০২৬ ০৪:০০

ঝকঝকে ছবির মতো দেশ। প্রকৃতিও অকৃপণ হাতে ঐশ্বর্য উজাড় করে দিয়েছে। জাপানের এমনই সৌন্দর্য যা একবার দেখলে ভোলা যায় না।

Advertisement

২০২৫ সালের মে মাস, মনস্থ করলাম জাপান যাব বেড়াতে। কিন্তু কলকাতা থেকে জাপান সরাসরি বিমান যোগাযোগ নেই। ব্যাংকক, কোয়ালালামপুর অথবা সিঙ্গাপুর হয়ে যেতে হয়। আমাদের যাত্রা কোয়ালালামপুর হয়ে। সেখানে তিন ঘণ্টা লে-ওভার কাটিয়ে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে চড়লাম সকাল ন’টার সময়। জাপানের নারিতা এয়ারপোর্টে পৌঁছতে প্রায় বিকেল গড়িয়ে গেল। ইমিগ্রেশনের ফর্মালিটি শেষ করতে আরও ঘণ্টা খানেক। এয়ারপোর্টের বাইরে গাইড মেই উচিতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কলকাতা থেকেই ইমেইল মারফত যোগাযোগ করে এসেছি। এই ক’দিনে ও আমাদের সফরসঙ্গী। আমরা মোট ছ’জন। মেই নিজের গাড়ি ইসুজু চালিয়ে নিয়ে যাবে। নারিতা থেকে টোকিও প্রায় সত্তর কিলোমিটার পথ। গাড়িভাড়া মোটামুটি চোদ্দোশো থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা। গাড়ির মানের উপর ভাড়া নির্ভর কবে ।  
টোকিওর হোটেলটি পরিষ্কার। ঝকঝকে চারপাশ। ট্যুর আইটেনারেরিতে প্রথম দিন কিছু রাখা ছিল না। পরের দিন সকালে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট খেয়ে তৈরি হয়েছি এমন সময় মেইয়ের ফোন। সে রিসেপশনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আজ যাব কামাকুরা দায়বস্তু টেম্পল দেখতে। স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে আটটা তাই মানুষের ঢল নেমেছে রাস্তায়। সবাই অফিস যাচ্ছে। এখানে এসে জাপান সম্বন্ধে একটাই ধারণা হয়েছে— এখানকার মানুষের সততা, তীব্র দেশপ্রেম, ধার্মিক মানসিকতা, পরিশ্রমী স্বভাব ও নিষ্ঠা দেশকে সেরার মর্যাদা দিয়েছে। পাহাড় আর সবুজ গাছপালা ঘেরা রাস্তার মধ্যে দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। জাপানে ভাষা সমস্যা খুব। কেউ ইংরেজি বলতে পারে না। নিজেদের ভাষার বাইরে যেতে চায় না। তাই যারা চাকরি বা পড়াশোনা করতে আসে তাদের জাপানি ভাষা শিখে নিতে হয়। কিন্তু মেই ভালো ইংরেজি বলতে পারে। সেই কারণে আমাদের অসুবিধে হয়নি।
চলতে চলতে এক জায়গায় গাড়ি এসে থামে। টিকিট কেটে অন্য পর্যটকদের অনুসরণ করি। সরু সরু বাঁশ গাছের বন। পায়ে চলার রাস্তা ভীষণ সুন্দর। ভেতরে ত্রয়োদশ শতকের কামাকুরা বৌদ্ধ মূর্তি। জাপানিরা ধূপ, মোমবাতি জ্বালাচ্ছে। সেখান থেকে বেরিয়ে চলে আসি সমুদ্রের ধারে সুন্দর এক রেস্তরাঁয়। সামনে প্রশান্ত মহাসাগর। প্রচুর স্পিডবোট যাচ্ছে। মেই আমাদের হাতে বাইনোকুলার দিয়ে বলে দূরে দেখতে। দূরে যে দ্বীপ দেখা যায় ওটা রাশিয়ান অয়েল ফিল্ড। সামনে রাশিয়ান নৌ বাহিনীর জাহাজ। সব দেখে ফিরতে সন্ধ্যা হল। পরেরদিন সকালেই মেই এসে হাজির। আজ দীর্ঘ সফর। যাব মাউন্ট ফুজি। মেই আজ একটা পান্না সবুজ স্কার্ট পরে আছে চোখে সানগ্লাস। ফুজি মাউন্টেন টোকিও থেকে প্রায় ১৫২ কিলোমিটার। মেই যা স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে তাতে ঘণ্টা দুয়েকের বেশি লাগার কথা নয়। রাস্তা ভীষণ সুন্দর। জাপানে চেরি ফুল ফোটার সময় ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল। আমরা মে মাসে এসেছি। চেরি ফুল তাই প্রায় নেই। তবে যাওয়ার পথে পাহাড়ের ধারে কিছু ফুল দেখলাম, অসাধারণ। এক জায়গায় এসে মেই আমাদের বাঁ দিকে তাকাতে বলল। দূরে মাউন্ট ফুজি দেখা যাচ্ছে। ও বলল ক’দিন যাত্রী নিয়ে আসছে কিন্তু রোজই মেঘলা থাকে। আজ আমাদের ভাগ্য ভালো। রোদ ঝলমলে আকাশ। ফুজি মাউন্টেন দেখার অনেকগুলো ভিউ পয়েন্ট আছে। ওঠার জন্য সিঁড়ি আছে আবার রাস্তাও আছে। সবুজ গাছে ঢাকা রাস্তা। বহুবছর আগে পিন্ডারি গ্লেসিয়ার গিয়েছিলাম। এই রাস্তা খানিকটা সেইরকম। আমাদের সৌভাগ্য ঝকঝক করছে মাউন্ট ফুজি। প্রচুর বিদেশি পর্যটক এখানে। সকলেই ছবি তুলছেন ব্যস্ত হয়ে।
ওখান থেকে কাওগুছিয়া লেকে চলে আসে গাড়ি। বিশাল লেক। পাহাড় দিয়ে ঘেরা। লেকের মাঝখান থেকে মাউন্ট ফুজি দেখা যায়। বোট রাইডের ব্যবস্থা আছে। ভাড়া খুব বেশি। তবে একঘণ্টা দশ মিনিটের বোট রাইড দারুণ উপভোগ্য। ফেস্টুন আর বেলুন দিয়ে সাজানো বোট। সারাক্ষণ জাপানি তরুণীরা হাতে স্প্যানিশ গিটার নিয়ে গান গাইছে। আমার পাশে মেই। আমি জিজ্ঞাসা করি অন্য সময় কী করো? ও বলে, টোকিও স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন করার পর ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিমে ডিপ্লোমা করছে। সময় পেলে গাইড আর ড্রাইভারের কাজ করে। বোট রাইড শেষে পাহাড়ের কোলে একটা ছোট্ট রেস্তরাঁয় গাড়ি এসে দাঁড়ায়। চারদিকে পাহাড় আর জঙ্গল। আমাদের খাবারে আজ ঝিনুকের মাংস আর সেদ্ধ ডিম দিয়ে তৈরি স্যান্ডউইচ, খোলা ছাড়ানো কাঁকড়া, আনারস, পাকা কলা, পাকা পেঁপে, দই আর সেদ্ধ মুরগির মাংস। লাঞ্চ শেষ করে গ্রিন টি নিলাম। একটা ব্যাপার বারবার মনে উঁকি মারে। এবার সেটা জিজ্ঞেস করি, ‘মেই তোমাদের এখানে পোশাকের ব্যাপারে একটা জিনিস লক্ষ করছি। ছেলেদের প্যান্ট নীল বা কালো আর জামা সাদা বা ক্রিম অথবা আকাশি। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে গোলাপি, সাদা, সবুজ বা নীল। এরকম ইউনিফর্মের মতো কেন?’ ও বলে, ‘সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে জাপানিজ ইম্পেরিয়াল গভর্নমেন্ট আমাদের শিখিয়েছিল জামা কাপড়ের রঙে শৃঙ্খলা বজায় রাখার কথা। এখনও তা মানা হয়।’
ফেরার সময় ঐশী ফ্লাওয়ার গার্ডেন একবার না দেখলেই নয়। অনন্ত লেকের চারদিকে পাহাড়। দূরে মাউন্ট ফুজি দেখা যাচ্ছে। বিচিত্র ফুলের বাহার। সামনে একটা হ্যান্ডিক্রাফট শোরুম। কিন্তু দাম খুব বেশি। এখান থেকে ফুজি মাউন্টেন দেখা যাচ্ছে কিন্তু মেঘে ঢাকা। পাশেই একটা টি প্রসেসিং সেন্টার। জাপানিরা শৌখিন ফ্লেভার্ড চা খেতে ভালোবাসে। এখানে চা পরিবেশনের ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। ছ’রকম চা সুন্দর কাপে ঢেলে পরিবেশন করবে। কোনো টাকা লাগবে না। ভালো লাগলে কিনতে পারি। এত রকম চা পান করার পর না কিনলেই নয়। তাই দশটা টি ব্যাগের বাক্স কিনলাম দেড় হাজার টাকার বিনিময়ে। চা খেতে খেতে মেই বলল, ওর খুব ভারতে যাওয়ার ইচ্ছে। সময় সুযোগ ও টাকা জোগাড় করতে পারলে ও যাবেই। বলল, ‘আমাদের ইম্পেরিয়াল মিলিটারি তোমাদের সুভাষ বসুকে আর্মস দিয়ে সাহায্য করেছিল। আজাদ হিন্দ ফৌজ-এর ব্রিটিশ সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ের কথা আমরা পড়েছি। তাই তোমাদের দেশটা দেখার ইচ্ছে আছে।’   
জাপানে গিয়ে শিল্প সংস্কৃতি কিছু দেখব বা জানব না এমন কি হয়? তাই পরের দিন সকালে বেরিয়েছি জাপান মডার্ন আর্ট মিউজিয়াম দেখতে। টোকিও শহরের অদূরেই এই মিউজিয়াম। আজ গাড়ি নিইনি। দু’বার মেট্রো রেল বদল করে নামলাম তাকেবাঁশি মেট্রো স্টেশনে। মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে সবুজ গাছে ঢাকা রাস্তা দিয়ে হেঁটে হাজির হই ন্যাশনাল মিউজিয়াম ফর মডার্ন আর্ট-এ। মিউজিয়ামের ভেতরটা অন্ধকার। কেবল মাউন্ট করা ছবিগুলো জোরাল আলো দিয়ে ফোকাস করা আছে। মেই গাইড ঠিক করে দিয়েছে। গাইড ওসাকা ইউনিভার্সিটি থেকে কনটেম্পোরারি আর্ট নিয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করছে। তার প্রজেক্টের একটা অংশ পর্যটকদের জাপানিজ আর্ট সম্বন্ধে বোঝানো। জাপানি চিত্রকলা মূলত জলরঙের। তবে প্যাস্টেল, স্কেচ, কালি, কাঠকয়লা আর অ্যাক্রিলিকের ছবিও আছে। ছবির বিষয়বস্তু নিসর্গ, পশুপাখি, আধ্যাত্মিক চেতনাবোধ ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ এই উজ্জ্বল হালকা জলরঙের ছবি দেখে প্রভাবিত হয়েছিলেন। 
মিউজিয়াম দেখে ট্যাক্সি করে চলে আসি শহরের শেষ প্রান্তে, যেখানে এপসন বর্ডারলেস লাইট এফেক্ট শো হচ্ছে। টিকিট কেটে ভেতরে গিয়ে অবাক হই। আলোর রেখা বা স্ক্যাটারিং লাইটকে কাজে লাগিয়ে অজস্র আলোর খেলা তৈরি করা হচ্ছে এখানে। কোথাও নকশা তৈরি হচ্ছে, কোথাও বা জ্যামিতির কারুকাজ। এইসব আলোকচিত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে। বাইরে বেরিয়ে এসে মঙ্গোলিয়ান রেস্তরাঁয় রাতের খাবার সেরে নিলাম। রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে দেখি রাতের টোকিও আলোয় উদ্ভাসিত। চারদিকে হ্যালোজেন আর নিওন আলোর খেলা। যেন আলোর জোয়ার ভেসে চলেছে রাস্তা দিয়ে। রাতের টোকিওকে উপভোগ করতে করতে হোটেলে ফিরলাম।
পরেরদিন চলেছি জাপানের একেবারে উত্তর দিকে নিক্কো ন্যাশনাল পার্ক। আজই ভ্রমণের শেষ দিন। আবহাওয়া বেশ খারাপ। জোরে ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে। সঙ্গে দমকা বাতাস। প্রশান্ত মহাসাগরে গভীর নিম্নচাপ হয়েছে। অনেকটা যাওয়ার পর হিল স্টেশনের মতো রাস্তা পাক খেয়ে উপরে উঠতে লাগল। ধোঁয়ার মতো কুয়াশা। রোপওয়ে বন্ধ। তবে কেগন জলপ্রপাত দেখার জন্য  লিফট রয়েছে। তাই দিয়ে নীচে নেমে ব্যালকনিতে দাঁড়ালাম। বৃষ্টির তোড়ে জলপ্রপাতও উত্তাল। ওখান থেকেই দেখে নিলাম নিক্কো পার্কের প্যাগোডা। জাপানের অন্যতম ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এটা। সন্ধে নেমে আসছে, মেই জোরে গাড়ি চালায়। সন্ধের মধ্যেই হোটেলে পৌঁছে ফেরার প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। 
পরের দিন রাত থাকতেই মেই হোটেলে হাজির। নারিতা এয়ারপোর্টে এসে বলল ‘মাতা কিতে কুদাসাই’ আমাদের ভাষায় যার অর্থ ‘আবার এসো’।  


সোমনাথ মজুমদার

কীভাবে যাবেন:

কলকাতা থেকে জাপান সরাসরি বিমান যোগাযোগ নেই। ব্যাংকক, কোয়ালালামপুর অথবা সিঙ্গাপুর হয়ে যেতে হয়। তবে ভারতের অন্যান্য রাজ্য যেমন মুম্বই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরু থেকে যদি যেতে চান তাহলে সরাসরি বিমান রয়েছে টোকিও যাওয়ার। সরাসরি বিমান পরিসেবা পেলে মোটামুটি ৯ ঘণ্টা লাগে। আর ভেঙে যেতে হলে দশ থেকে বারো ঘণ্টা সময় লাগে পৌঁছতে।

সম্পর্কিত সংবাদ