Bartaman Logo
১৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কঠিন পরীক্ষা

কঠিন পরীক্ষা
  • ৮ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
Prefer us on Google
প্রত্যাশার চাপ ছিল সব মহলে। মধ্যবিত্ত ভেবেছিল, ব্যাঙ্ক ঋণে সুদের হার কমলে মাসিক কিস্তির টাকা কম দিতে হবে। তাতে সংসার চালানোর খরচে কিছুটা সুরাহা মিলবে। শিল্প-বাণিজ্য মহল মনে করেছিল, সুদ কমলে উৎপাদন খরচে কিছুটা হলেও সুবিধা মিলবে। সুদের হার কমানোর চাপ ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের তরফেও। কিন্তু চড়া হারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে রেপো রেট সাড়ে ৬ শতাংশে অপরিবর্তিতই রাখল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। সর্বোচ্চ ব্যাঙ্কের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাঙ্ক ঋণে সুদের হার শেষবারের মতো কমেছিল কোভিডের সময়ে, সাড়ে চার বছর আগে ২০২০ সালের ২২ মে। তারপর ২০২৩- এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রেপো রেট শুধুই বেড়েছে। সেই থেকে সুদের হার অপরিবর্তিতই রয়েছে। আরবিআইয়ের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস যুক্তি দিয়েছেন, খাদ্যপণ্যে মূল্যবৃদ্ধির রক্তচক্ষু এখনও যথেষ্ট তীব্র। এর ফলে অর্থনীতিতে ঝুঁকি বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এই অবস্থায় রেপো রেট কমানো সম্ভব নয়। মূল্যবৃদ্ধির কারণকে গুরুত্ব না দিয়ে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী থেকে সরকারের তাবৎ আমলারা রেপো রেট কমানোর জন্য আরবিআইয়ের উপর বারবার চাপ সৃষ্টি করেছে। যদিও গভর্নরের ব্যাখ্যার পর প্রশ্ন উঠেছে, গত প্রায় দু’বছর রেপো রেট অপরিবর্তিত থাকা সত্ত্বেও মূল্যবৃদ্ধির হার কেন নিয়ন্ত্রণে না এসে উল্টে বেড়ে গেল? 
Advertisement
ঘটনা হল, কেন্দ্র মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের দাবি করে রেপো রেট কমানোর জন্য চাপ দিলেও তাদের সরকারই তথ্য দিয়ে জানিয়েছে, শহর ও গ্রামীণ ভারতে মানুষের ভোগব্যয় কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে জিডিপিতে। এই ভোগব্যয় কমার মূল কারণই হল চড়া হারে মূল্যবৃদ্ধি, যার জেরে মানুষের সঞ্চয় কমে গিয়েছে। এই কারণে চলতি অর্থবর্ষের শেষে জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭.২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ধরা হয়েছে ৬.৬ শতাংশ। জুলাই-সেপ্টেম্বরের ত্রৈমাসিকে এই বৃদ্ধির হার নেমেছিল ৫.৪ শতাংশে। একইভাবে অর্থবর্ষের শেষে মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে ৪.৮ শতাংশ। গত অক্টোবরে মূল্যবৃদ্ধির হার ৬.২১ শতাংশে পৌঁছেছিল। তার মানে মোদি সরকার যে কাল্পনিক ছবিই তুলে ধরুক জিডিপি ও মূল্যবৃদ্ধির কোনও পূর্বাভাসই যে মিলবে না তা জলের মতো পরিষ্কার। যদিও অর্থবর্ষের শেষের দিকে মূল্যবৃদ্ধির হার লক্ষ্যমাত্রার (৪ শতাংশ) ধারে কাছে থাকতে পারে বলে ফের আষাঢ়ে গল্প শোনানো হচ্ছে কেন্দ্রের তরফে। কিন্তু তা হতে গেলে জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের উপরে হতে হবে, যা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ব্যাঙ্কের সুদের হার সামান্য কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। এ জন্য খাদ্যপণ্যের জোগান বাড়াতে হবে। জোগান বাড়লে বাজারে সরবরাহ বাড়বে, সরবরাহ বাড়লে দামও কমবে। এটা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাজ নয়, এটা কেন্দ্রেরই দেখার দায়িত্ব। কিন্তু কে শোনে এই সদুপদেশ? ফলে সাধারণ মানুষ সেই আতান্তরেই রয়েছে। একদিকে উচ্চহারে মূল্যবৃদ্ধি, জিডিপির হার কমে যাওয়া, অন্যদিকে ব্যাঙ্কে সুদের হার অপরিবর্তিত থাকায় গোটা অর্থনীতিটাই থমকে গিয়েছে। এর অবশ্যম্ভাবী প্রভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমবে, নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বেতন ও মজুরিতে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে আরও সঙ্গীন হয়ে উঠতে পারে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। 
তবু এর মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলার জন্য খানিক আশার ছবি উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যানে। তাতে দেখা যাচ্ছে, বঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির হার অন্তত এক ডজন রাজ্যের তুলনায় কম। এর মধ্যে বিজেপি শাসিত রাজ্যের সংখ্যাই দশটি। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ছ’মাসে মূল্যবৃদ্ধির হারের জাতীয় গড় ছিল ৪.৬ শতাংশ। একে ছাপিয়ে গিয়েছে বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, অসম, বিহার, হরিয়ানা, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, ত্রিপুরা, মণিপুর, ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশ। এর বাইরে দুটি রাজ্য হল কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটক এবং বাম শাসিত কেরল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির হার ৩.৬ শতাংশে বেঁধে রাখা সম্ভব হয়েছে, যা আশার কথা। অর্থমন্ত্রকের মতে, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে থাকে মূলত যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্যপণ্যের মজুদ, প্রয়োজন মতো তা বাজারে সরবরাহের ব্যবস্থা করা, জোগান অব্যাহত রাখতে আমদানি-রপ্তানি নীতি নেওয়া, কালোবাজারি ও বেআইনি মজুদদারি রুখতে সরকারি পদক্ষেপের উপর। সন্দেহ নেই, এসব ক্ষেত্রেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমিকা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবু আত্মতুষ্টির যে কোনও জায়গা নেই তা বলাই বাহুল্য।
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ