সৌম্য নিয়োগী, কলকাতা: ‘সেরকম কিছু আছে নাকি?’ প্রশ্নটারই যেন অপেক্ষায় ছিলেন স্টলের মুখেই ক্যাশ-টেবিলের ওপারে বসা মানুষটি। সাদা প্লাইউডের সেই টেবিলের তলা কার্যত আলিবাবার গুহা! সেখান থেকেই বের করে আনলেন প্লাস্টিকের ব্যাগবন্দি গুপ্তধন। পিচবোর্ডে বাঁধানো পাতলা বই। হলদে রঙের মলাটে কালো মার্কার পেন দিয়ে বাংলায় লেখা,‘কুমারসম্ভব’। মলাট ওল্টাতেই ম্যাজিক। কালচে হয়ে আসা, পোকায় খাওয়া পাতার উপরে লেখা ‘দ্য কুমার সম্ভব বাই কালিদাস’। নীচে লেখকের নাম, রেভ. কে এম ব্যানার্জি, যার শেষ অক্ষরটি ‘ই’ নয়, ‘এ’। ‘এ তো.. এ তো রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়?’ মৃদু হেসে সায় দিলেন স্টল কর্ণধার। আঙুল দিয়ে দেখালেন নীচে লেখা প্রকাশকাল— ‘১৮৬৭’। ১৫৮ বছর আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ছাপানো বই। লাফিয়ে উঠলেন প্রশ্নকর্তা!
Advertisement
বইমেলা মানেই নতুন বইয়ের গন্ধ। নতুন নতুন লেখকদের আবিষ্কার করার আনন্দ। পাঠকদের চাহিদার কথা ভেবে সেজে ওঠা বড়-ছোট স্টলের সারি। ঝকমারি আলোয় সাজানো সেই সব পসরা থেকে একেবারেই আলাদা সবুজপত্র প্রকাশন। বইমেলার ৭ বা ৮ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে সোজা এসে লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নের দিকে আসার আগেই ৪৩৮ নম্বর স্টলটি। বাইরে শুধু লেখা ‘দুষ্প্রাপ্য বই’। ভিতরে জায়গাও বেশি নেই। তিন দেওয়ালেই থরে থরে সাজানো পুরনো বই। মাঝে টেবিল, তার উপর নীচেও জীর্ণ, হলদেটে মলাটের ম্যাগাজিন ডাঁই করে রাখা। সে সবের ভিতরে আঙুল চালিয়েই পাঠক খুঁজে নিচ্ছেন অমূল্য রতন! আর তা দেখতে দেখতে হাসি ছড়িয়ে পড়ছে সবুজপত্রের কর্ণধার শুভাশিস ভট্টাচার্যের মুখে চোখে।
উনিশ শতকের অন্যতম মনীষী রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। ডিরোজিও’র শিষ্য। আলকেজান্ডার ডাফের হাত ধরে তাঁর খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ তৎকালীন বাঙালি সমাজে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। মহাকবি মধুসূদন দত্তের ‘মাইকেল’ হওয়াও কৃষ্ণমোহনের হাত ধরেই। ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের। লর্ড মেকলের সুবাদে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার জয়জয়কার। আর সেই কারণেই শিক্ষাবিদ কৃষ্ণমোহনের এই কালিদাস অনুবাদ। শুভাশিসবাবুর এই ‘আলিবাবার গুহা’য় কিন্তু এই ১৫৮ বছর পুরনো বইটিই একমাত্র নয়। কথায় কথায় বেরিয়ে এল আরও কিছু ফেলে আসা মণিমুক্তো। তার মধ্যে অন্যতম ১৭৭৩ সালে লন্ডনে ছাপা ‘ডিকশনারি অব দ্য হিন্দোস্তান ল্যাংগুয়েজ’। ইংরেজি-হিন্দি অভিধানটির সম্পাদনা তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেন জন ফার্গুসনের। বলাই বাহুল্য কোম্পানির সাহেবদের হিন্দি শিক্ষার জন্যই এমন একটি উদ্যোগ। রয়েছে শ্রীরামপুর বটতলা থেকে প্রকাশিত ‘দণ্ডিপর্ব্ব’। বৃহৎকূর্ম্ম পুরাণের অন্তর্গত এই বইয়ের প্রকাশকাল ১৮৪৩। শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের উইলিয়াম কেরির হাত ধরেই প্রথম ছাপাখানার মুখ দেখে বাংলা ভাষা। সেই বাংলা হরফ তৈরি করেছিলেন পঞ্চানন কর্মকার। শুভাশিসবাবুর কাছে থাকা ‘দণ্ডিপর্ব্ব’-এ রয়েছে তাঁর নাতির হাতযশ।
বইমেলাজুড়ে বড় বড় প্রকাশনা সংস্থার স্টলে যখন উপচে পড়ছে ভিড়, তখন নিঃশব্দ সবুজপত্র। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার গোটা সেটটির দ্বিতীয় সংস্করণ পড়ে রয়েছে অগোছালোভাবে। ব্যতিক্রমী এই প্রকাশনা সংস্থার কাণ্ডারী শুভাশিসবাবু জানালেন, ‘গতবার ১৯১৩ সালে লন্ডনে প্রকাশিত গীতাঞ্জলির প্রথম ইংরেজি সংস্করণ ছিল। এবার অধিকাংশ দুষ্প্রাপ্য বই উনিশ শতকের। এ আমার নেশা। যাঁরা এসবের খবর রাখেন, তাঁরা ঠিক চলে আসেন।’
মজার বিষয় হল, এই স্টলে বইয়ের নির্দিষ্ট কোনও দাম নেই। গুরুত্ব অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করেন শুভাশিসবাবু। দরাদরিও চলে দেদার। তবে ক্রেতারা জানেন, এসব সম্পদের জন্য কোনও দামই যথেষ্ট নয়!
উনিশ শতকের অন্যতম মনীষী রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। ডিরোজিও’র শিষ্য। আলকেজান্ডার ডাফের হাত ধরে তাঁর খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ তৎকালীন বাঙালি সমাজে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। মহাকবি মধুসূদন দত্তের ‘মাইকেল’ হওয়াও কৃষ্ণমোহনের হাত ধরেই। ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের। লর্ড মেকলের সুবাদে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার জয়জয়কার। আর সেই কারণেই শিক্ষাবিদ কৃষ্ণমোহনের এই কালিদাস অনুবাদ। শুভাশিসবাবুর এই ‘আলিবাবার গুহা’য় কিন্তু এই ১৫৮ বছর পুরনো বইটিই একমাত্র নয়। কথায় কথায় বেরিয়ে এল আরও কিছু ফেলে আসা মণিমুক্তো। তার মধ্যে অন্যতম ১৭৭৩ সালে লন্ডনে ছাপা ‘ডিকশনারি অব দ্য হিন্দোস্তান ল্যাংগুয়েজ’। ইংরেজি-হিন্দি অভিধানটির সম্পাদনা তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেন জন ফার্গুসনের। বলাই বাহুল্য কোম্পানির সাহেবদের হিন্দি শিক্ষার জন্যই এমন একটি উদ্যোগ। রয়েছে শ্রীরামপুর বটতলা থেকে প্রকাশিত ‘দণ্ডিপর্ব্ব’। বৃহৎকূর্ম্ম পুরাণের অন্তর্গত এই বইয়ের প্রকাশকাল ১৮৪৩। শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের উইলিয়াম কেরির হাত ধরেই প্রথম ছাপাখানার মুখ দেখে বাংলা ভাষা। সেই বাংলা হরফ তৈরি করেছিলেন পঞ্চানন কর্মকার। শুভাশিসবাবুর কাছে থাকা ‘দণ্ডিপর্ব্ব’-এ রয়েছে তাঁর নাতির হাতযশ।
বইমেলাজুড়ে বড় বড় প্রকাশনা সংস্থার স্টলে যখন উপচে পড়ছে ভিড়, তখন নিঃশব্দ সবুজপত্র। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার গোটা সেটটির দ্বিতীয় সংস্করণ পড়ে রয়েছে অগোছালোভাবে। ব্যতিক্রমী এই প্রকাশনা সংস্থার কাণ্ডারী শুভাশিসবাবু জানালেন, ‘গতবার ১৯১৩ সালে লন্ডনে প্রকাশিত গীতাঞ্জলির প্রথম ইংরেজি সংস্করণ ছিল। এবার অধিকাংশ দুষ্প্রাপ্য বই উনিশ শতকের। এ আমার নেশা। যাঁরা এসবের খবর রাখেন, তাঁরা ঠিক চলে আসেন।’
মজার বিষয় হল, এই স্টলে বইয়ের নির্দিষ্ট কোনও দাম নেই। গুরুত্ব অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করেন শুভাশিসবাবু। দরাদরিও চলে দেদার। তবে ক্রেতারা জানেন, এসব সম্পদের জন্য কোনও দামই যথেষ্ট নয়!



