নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: শহর কলকাতার বাইরেও রাজ্যের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে এমন সব প্রাচীন পুজো, যা শুরু হয়েছিল জমিদার বাড়ির পৃষ্ঠপোষকতায় অথবা রাজবাড়ির অন্দরমহলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে পরিবেশ, আর্থ সমাজিক পরিস্থিতি। যোগ হয়েছে আধুনিকতা। পুজোগুলিতে কালের নিয়মে কিছু পরিবর্তন হলেও, উপাচারের মূল কাঠামো রয়েই গিয়েছে। কলকাতার কাছেই হুগলির কোন্নগরের বিশালাক্ষ্মী সড়ক এলাকাতেও আছে এমন পুজো, যেখানে আধুনিকতায় মিলেছে ঐতিহ্য। জমিদার চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির পুজো এমনই ইতিহাসের সাক্ষী বহন করছে। এই বাড়িতে এক সময় প্রচুর বেলগাছ ছিল। তারই নাম মাহাত্ম্যে এখন সেই জমিদার বাড়ির ৪০০ বছরের পুরনো পুজো বেলতলা বাড়ির দুর্গাপুজো নামেই পরিচিত।
এই বাড়ির প্রশস্ত ঠাকুরদালানের একাংশ ভেঙে পড়েছিল গত শতাব্দীতে। তার জেরে এক সময় পুজো বন্ধ হলেও, ১৯৯০ সাল থেকে ফের তা শুরু হয়, জানিয়েছেন পরিবারের অন্যতম সদস্য চন্দন মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, রথের দিন কাঠামো পুজো আমাদের পুরনো রীতি। প্রতি বছরই বিসর্জনের পর কাঠামো তুলে আনা হয় ঠাকুরদালানে। তাতে একটি চালচিত্রেই গড়া হয় প্রতিমা। পঞ্জিকা ধরে প্রতিবার পঞ্চমীতে শেষ হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। ওই দিন থেকেই বাড়ির কন্যা ও স্ত্রীরা মিলে তৈরি করেন চিনি ও গুড়ের নাড়ু, গাছ নাড়ু প্রভৃতি। পরিবারের এই প্রজন্মের সদস্যা সাত্বিকা মুখোপাধ্যায় একথা জানিয়ে বলেন, আমাদের পুজোয় মায়ের ভোগেও আছে অভিনবত্ব। সপ্তমীতে মাকে নিবেদন করা হয় সাত রকমের পদ ও সাত রকমের ভাজা। একইভাবে অষ্টমীতে মায়ের ভোগে থাকে আট রকমের পদ ও আট রকমের ভাজা। নবমীতে সেই সংখ্যা বদলে যায় নয়-এ। দশমীতে পান্তা ভাত নিবেদন করা হয় মা’কে। সঙ্গে থাকে কচুর শাক, চালকুমড়ি, পাঁচ রকমের ভাজা ও তেঁতুল দিয়ে ইলিশ মাছের টক। বিজয়ার দিন ভোগে ইলিশ ভাজা মাস্ট। আসলে ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে তো এ বাড়িতে এসে পান্তা খাওয়ার সুযোগ পান না উমা। তাই কৈলাসে যাওয়ার আগে এই আয়োজন, জানালেন সাত্বিকা।
পরিবারের সদস্য সৈকত মুখোপাধ্যায়ের কথায়, সন্ধিপুজোকে ঘিরে আমাদের বাড়িতে উন্মাদনা সব থেকে বেশি। এই সময় মাকে আলাদা করে ভোগ নিবেদন করা হয়। সেখানে স্পেশাল মেনু কাতলা মাছের ঝোল। বছরের পর বছর ধরে এই রীতি চলে আসছে। বেলতলা বাড়ির পুজোর সব রান্না বাড়ির সদস্যরাই করেন। মায়ের প্রতি আন্তরিকতা ও আদর জিইয়ে রাখতেই বাইরের কারও হাতে রান্নার ভার দেওয়া হয় না। বেলতলা বাড়ির পুজোয় মাকে ঘরের মেয়ে হিসেবে পুজো করাই রীতি। মেয়ের যত্নআত্তিতে কোনও খামতি যাতে না থাকে, সেদিকে পুজোর চারদিনই তীক্ষ্ণ নজর থাকে পরিবারের সদস্যদের। এবারও নিয়ম করে সেজে উঠেছে এই ঠাকুরদালান। সেখানে এখন আগমনির সুর ভরপুর।-নিজস্ব চিত্র