অর্পণ সেনগুপ্ত, কলকাতা: প্লাস্টিক দূষণ নতুন কিছু নয়। তবে, বিগত কয়েক বছর ধরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিপদ নিয়ে সাধারণ মানুষ এবং দেশের নীতি নির্ধারকদের সচেতন করছেন বিজ্ঞানীরা। তুলনায় অনেক কম হলেও পরিচিত বিপদ হল প্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকে যাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক। আর নতুন একটি গবেষণা বলছে, এই তালিকায় চারটি মেট্রোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে রাজ্যের রাজধানী। প্রতিদিন প্রচুর মাইক্রোপ্লাস্টিক শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশের ফলে তিলে তিলে আয়ুক্ষয় হচ্ছে তিলোত্তমার বাসিন্দাদের। এই তালিকায় কলকাতার নীচে রয়েছে নয়াদিল্লি। তারপরে চেন্নাই। অবাক করার বিষয় হল, শ্বাসযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক (আইএমপি) সবচেয়ে কম দেশের বাণিজ্য নগরী মুম্বইয়ে।
আইসার কলকাতা এ নিয়ে একটি অভিনব সমীক্ষা চালিয়েছে। আর্থ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ দার্ভার নেতৃত্বে চারটি মেট্রো শহরের বাতাসে ভাসমান মাইক্রোপ্লাস্টিকের নমুনা সংগ্রহ করেছে তারা। অত্যাধুনিক পাইরোলোসিস গ্যাস-ক্রোম্যাটোগ্রাফি/ মাস স্পেকট্রোনমি পদ্ধতি ব্যবহার করে খোঁজা হয়েছে আইএমপি। ১০ মাইক্রোমিটার ব্যাস বিশিষ্ট অতিসূক্ষ্ম কণা (পার্টিকুলেট ম্যাটার ১০ বা পিএম ১০) এবং ২.৫ মাইক্রোমিটার ব্যাসের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কণার (পিএম ২.৫) পরিমাণ যাচাই করা হয়েছে। দেখা গিয়েছে, কলকাতায় প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে শ্বাসযোগ্য প্লাস্টিক রয়েছে ১৪.২৩ মাইক্রোগ্রাম। দিল্লিতে সেই পরিমাণ ১৪.১৮ গ্রাম। চেন্নাইয়ের মতো সৈকত শহরেও এর পরিমাণ ৪ মাইক্রোগ্রাম। বন্দর, বড় বড় মার্কেট এবং ব্যস্ততার শীর্ষে থাকা মুম্বইয়ে এর পরিমাণ ২.৬৫ মাইক্রোগ্রাম। আরও একটি উদ্বেগের বিষয়, দু’ধরনের সূক্ষ্ম কণার ৫ শতাংশই মাইক্রোপ্লাস্টিক।
দিল্লির তুলনায় কলকাতার এগিয়ে থাকা এবং মুম্বইয়ের সবচেয়ে নীচে থাকাকে আপাতভাবে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। আইএমপি’র প্রধান উৎস হচ্ছে পলিস্টারমিশ্রিত পোশাক, প্লাস্টিক প্যাকেজিং, গাড়ির প্লাস্টিকের উপাংশ, জুতো, প্লাস্টিকনির্ভর নানা সজ্জা প্রভৃতি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে বাজার এলাকার। কলকাতায় অসংগঠিত বাজারের সংখ্যা প্রচুর। তাতে ব্যবহৃত নানা ধরনের প্লাস্টিকের সামগ্রী ঘর্ষণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বাতাসে মিশছে। এছাড়া, কলকাতা ও তার আশপাশ এলাকার ডাম্পিং গ্রাউন্ড বা ভাগাড়ে প্রায়ই আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। প্লাস্টিকের পণ্য পুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আইএমপি হিসেবে। কলকাতার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও বিপদের একটি কারণ। একদিক দিয়ে গঙ্গা বয়ে গেলেও কলকাতায় বদ্ধবায়ু বাকি শহরগুলির তুলনায় বেশি। জনঘনত্বও বেশি। তাই সেগুলি একই জায়গায় রয়ে যায়। শীতকালে সেই দূষিত বায়ু মাটির আরও কাছাকাছি নেমে আসে। এছাড়াও দুর্গাপুজো তথা অন্যান্য উৎসবকে কেন্দ্র করে বিপুল জনসমাগম, পলিস্টারের শীতপোশাক, কম্বল প্রভৃতির ব্যবহারও অন্যতম কারণ।
বিপদের প্রসঙ্গে আসা যাক। পিএম ১০ শরীর বের করে দিতে পারলেও পিএম ২.৫ কোনওভাবেই বের হয় না। ফুসফুস থেকে রক্তে, সেখান থেকে আরও স্পর্শকাতর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। প্লাস্টিক শুধু কার্সিনোজেনিক বা ক্যান্সার সৃষ্টি করে, তাই নয়। এছাড়াও নানা জটিল ব্যাধি ঘটায়। পিভিসি পণ্য, বিভিন্ন পারফিউমে ব্যবহার করা বিশেষ কেমিক্যাল, কসমেটিক্সে ব্যবহৃত বিশেষ যৌগ থেকেও বিশেষ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হয়। সেগুলি বিপাকক্রিয়া এবং যৌনস্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। বিজ্ঞানীদের দাবি, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে এনে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কিছুটা ক্ষতি কমানো যায়। সুতির পোশাক, চটের সামগ্রীর ব্যবহার যাতে বাড়ে, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন। সচেতন করতে হবে সাধারণ মানুষকেও। তবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।