সোহম কর, কলকাতা: গাড়ির কাচের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে সে তার সন্তানকে বলে, ‘ফিরে আসব। সামলে থেকো।’ বলতে বলতে ইঞ্জিনের শব্দ। গ্রামবাসী বোঝাই গাড়ি চলতে শুরু করে। স্থির চোখে বাবার চলে যাওয়া দেখছে নাবালক। পরক্ষণেই আচমকা বিস্ফোরণ! ভস্মীভূত হয়ে গেল সেই ভ্যান। লাল হয়ে যাওয়া চোখের কোল বেয়ে জল নেমে আসছে নাবালকের। সে চিত্কার করতে থাকল, ‘আব্বু! আব্বু!’ প্যালেস্টাইনের পরিচালক অ্যানিমারি জাকিরের ‘প্যালেস্টাইন ৩৬’-এর এই দৃশ্য দেখে রবীন্দ্রসদনের অন্ধকার যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। এভাবেই ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সব মঞ্চ হয়ে উঠল বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা গণহত্যা, যুদ্ধের প্রতিবাদ ক্ষেত্র। শুধুই ছবি নয়, প্রতি ছবির প্রাক্কালে দেখানো হয়েছে যুদ্ধ বিরোধী ‘ক্রিয়েটিভ’। যেখানে লেবানন, প্যালেস্টাইন, সুদানের অসহায় মানুষের টুকরো ছবির সঙ্গে মিশে গিয়েছেন ঋত্বিক-সত্যজিত্। যার শেষে বাঙালি শিশু গেয়ে ওঠে ‘ও রে! হাল্লা রাজার সেনা, তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল।’ আর বাঙালি? ক্রিয়েটিভ দেখেই হাততালি দিয়ে জানিয়েছে তাঁদের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান।
যুদ্ধ, গণহত্যা বিরোধী ছবি দেখানোর জন্য চলচ্চিত্র উত্সবে রাখা হয়েছিল নতুন বিভাগ ‘বিয়ন্ড বর্ডারস’। সেখানে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলির ন’টি ছবি রাখা হয়েছে। ক্রিয়েটিভে দেখানো হয়েছে দূর দেশের ডিটেনশন ক্যাম্প, লাখ লাখ মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছেন। দেখানো হয়েছে, বন্দুকধারীদের দখল নেওয়া। তার সঙ্গে মিশেছে ঋত্বিকের পার্টিশনের গল্পের চিত্র। সত্যজিতের যুদ্ধবিরোধী উক্তি আর দান। উত্সবের চেয়ারম্যান চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ বলছিলেন, ‘আমি ক্রিয়েটিভ তৈরির ওই আইডিয়া দিয়েছিলাম। সারা বিশ্বজুড়ে গণহত্যা চলছে। গাজা সহ বিভিন্ন দেশে মানুষ যাযাবর হয়ে যাচ্ছেন। চলচ্চিত্র পরিচালকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেইসব ছবি তৈরি করেছেন। এই উত্সবের মাধ্যমে বলতে চাইছি, শান্তি চাই। অসহিষ্ণুতা, অমানবিকতা, যুদ্ধের বিরুদ্ধে এটাই আমাদের প্রতিবাদ।’
প্রতিবাদ জানানোর ভাষা থাকে না লেবাননের তথ্যচিত্র ‘টেলস অব দি উন্ডেড ল্যান্ড’-এর ছোট্ট শিশুটির। যুদ্ধ শেষে গাড়িতে সে যখন বাড়ি ফেরে, ধ্বংসলীলা দেখে সে মায়ের পাশের সিটে বসতে চায়। কেঁদে ওঠে। ফিরে এসে আশ্বস্ত হয়, বাড়ি ভাঙলেও তা দাঁড়িয়ে রয়েছে। শিল্পপ্রেমী কলকাতাবাসীর মনে পড়ে যায় প্যালেস্টাইনের কবি মেহমুদ দারবিশের কবিতা, কবে আমাদের দেখা হবে? যেদিন যুদ্ধ শেষ হবে/ কবে যুদ্ধ শেষ হবে? যেদিন আমাদের দেখা হবে।