নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: নয় নয় করে ১০০ বছর বয়স হবে এই হাটটির। দক্ষিণ কলকাতার খাস অঞ্চল কালীঘাট। সেখানে বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে সেই কোম্পানির আমল থেকে বসছে ‘বিপত্তারিণী হাট’। ১০০ বছর আগের কোনও ছবি যদি এখন হাতে আসে তাহলে তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, হাটের চেহারার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। মনে হবে টাইম মেশিনে চেপে এক শতাব্দী আগে এই জাস্ট পৌঁছনো গেল। এখনও সেরকমই গ্রামীণ, সেরকমই প্রাচীন মহানগরের বিপত্তারিণী হাট।
রাস্তাজুড়ে দশহাত দূরে দূরে বিপত্তারিণী ঠাকুরের মূর্তি। পুজো চলছে। গা ঠেসাঠেসি করে হরেক কিসিমের পসরার মেলা। জিনিসপত্রের দাম বর্তমান বাজার দরের তুলনায় অনেক কম। ছোটদের জন্য কাঠের খেলনা যেমন মেলে তেমন মেলে হাঁড়ি-কলসিও। নিম্নবিত্তের পেট ভরাতে দোকান দেন আরও গরিব মুড়ি-চানাচুরওয়ালা। পুরি-সব্জির দোকান ইতিউতি উঁকি দেয়। সর্বক্ষণই ভিড়ে থিকথিক করে চত্বর। প্রতিবছর দু’দিন মাত্র বসে বিপত্তারিণী হাট। গত শনিবার বসেছিল। তারপর ফের বসেছে সোমবার রাতে। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর উঠে গিয়েছে। আবার এক বছরের অপেক্ষা।
মঙ্গলবার দুপুরেও কালীঘাটে নতুন তৈরি হওয়া স্কাইওয়াকের নীচে মানুষের লাইন। রাসবিহারী মোড় থেকে বড় রাস্তার দু’পাশে দোকান। সবমিলিয়ে হই হই কাণ্ড! বসেছে ফল-ফুল, পুজোর সামগ্রীর দোকান। মঞ্চ বেঁধে হচ্ছে পুজো। অঞ্জলির পর মাইকে পুরোহিত বললেন, ‘যাঁরা অঞ্জলি দিলেন, দক্ষিণা দিয়ে যান। পরে হাতে তাগা পরে নেবেন।’ একটা ঝুড়িতে ১৩ রকমের ফল, দাম চমকে দেয়। মাত্র ৪০ টাকা। দূরদূরান্তের নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষ যাতে সস্তায় ফল কিনতে পারেন তাই এমন দাম রেখেছেন বিক্রেতারা। বসেছে মিষ্টির ফেরিওয়ালারা। এক বাক্স মিষ্টির দাম ২০ কিংবা ৩০ টাকা। ফুলের প্যাকেট পাঁচ টাকা।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুর থেকে এসেছিলেন শ্যামলী নস্কর। ঘাম মুছে বললেন, ‘রাত থাকতে উঠে ফার্স্ট ট্রেনে করে উঠে এসেছি। লম্বা লাইন পড়ে বলে তাড়াতাড়ি এলাম। কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে তাই না। নির্বিঘ্নে পুজো দিতে পেরেছি।’ পুরি বিক্রেতা বললেন, ‘সেই রাত দু’টো থেকে চলছে। আর শরীর দিচ্ছে না।’ মুড়ি-বেগুনির দোকানদার বলেন, ‘ভোর চারটেতে এসেছি।’ বাস ধরে বাড়ি ফিরবেন। কালীঘাট মোড়ে দাঁড়িয়ে এক মহিলা পুণ্যার্থী বলেন, ‘রাত দু’টো থেকে বসেছেন ওঁরা?’ আসলে তখন থেকেই তো লাইন পড়ে যায়!’ পথচলতি বাসিন্দাটি স্থানীয়। বললেন, ‘ছোটবেলা থেকে এই ছবি দেখে আসছি। এখনও দক্ষিণ কলকাতায় এমন হাট বসে ভাবা যায় না।’
‘বিপদ থেকে সন্তানকে রক্ষা করো ঠাকুর। পরিবারকে ভালো রেখো’-বিপত্তারিণীর কাছে পুজো দিয়ে মঙ্গল চান বাংলার মহিলারা। বাংলার এ প্রাচীন রীতি আধুনিক কলকাতাতেও রাত জাগিয়ে রাখে মনুষকে। এখনও ফিরিয়ে দেয় কোম্পানি আমলের ভক্তির ছবি।