নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: মেয়ে বাড়িতে আসার পর ইলিশ রান্না করব। আর ও খুব পটলভাজা পছন্দ করে। ওখানে তো এসব খেতে পারে না..’ বললেন শ্রাবন্তী বর। ভারোত্তোলনে কমনওয়েলথ ইউথ চ্যাম্পিয়নশিপে ৫৩ কেজি বিভাগে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে মেয়ে কোয়েল বর। মুখ্যমন্ত্রী সকালবেলায় তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা দেন। তা ছড়িয়ে পড়তেই ধূলাগড়ের ব্যানার্জি পাড়ার টালির ছোট বাড়িটায় উপচে পড়া ভিড়। এক মুরগি বিক্রেতার মেয়ে গর্বিত করেছে বাংলাকে। সবকিছু অনেকটা স্বপ্নের মতো লাগছে কোয়েলের বাবা মিঠুন বরের।
সাঁকরাইলের ধূলাগড়ের ব্যানার্জি পাড়ার বাসিন্দা কোয়েল বর। সে দশম শ্রেণিতে পড়ে। স্বপ্ন দেখে কর্ণম মালেশ্বরী বা মীরাবাই চানু হয়ে ওঠার। এখন অলিম্পিক পাখির চোখ। তাই কঠোর পরিশ্রম চলছে। আহমেদাবাদে কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপে মেয়েদের জুনিয়র ও সাব-জুনিয়র বিভাগে জোড়া সোনা জিতেছে। মোট ১৯২ কেজি ওজন তুলে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। মঙ্গলবার রাতে মেয়ের ফোন আসে মা-বাবার কাছে। তারপর গোটা রাত জেগে যেন স্বপ্নের মধ্যে কাটিয়েছেন মিঠুনবাবু। একসময় তিনিও ভারোত্তোলন করতেন। কিন্তু অভাবের সংসার বলে স্বপ্নপূরণ করতে পারেননি। নিজের অধরা স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছিলেন মেয়ের মনে। তারপর ছোট মেয়েটির কাছে বাবা হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণা। ২০১৮ সালে মিঠুনবাবু তাকে ভর্তি করালেন বন্ধু অষ্টম দাসের দেউলপুরের আখড়ায়। হাতেখড়ি হল কোয়েলের।
বাড়ির কাছে একটি ছোট মুরগির মাংসের দোকান রয়েছে মিঠুনবাবুর। সামান্য রোজগারে স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কোনওমতে সংসার নির্বাহ করেন। তিনি বলেন, ‘করোনার সময় দোকান বন্ধ ছিল। কোনও কাজ ছিল না। কিন্তু তখনও মেয়ের প্রশিক্ষণ বন্ধ হতে দিইনি। বহু লড়াই করে মেয়ে এই জায়গায় এসেছে। একদিন দেশের নাম উজ্জ্বল করবে।’ ভারোত্তোলনের পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনাও চালাচ্ছে কোয়েল। আগামী বছর পাঁচলার দেউলপুর হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক দেবে। মেয়ের মত ছেলে সৌম্যও ভারোত্তোলন করুক চান মা শ্রাবন্তীদেবী। ১১ বছরের সৌম্য এখন প্রশিক্ষণ নিতে পুনের সেনা শিবিরে রয়েছে।
শ্রাবন্তীদেবী বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী মেয়ের সাফল্যে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আরও গর্ব হচ্ছে। মেয়ে বাড়িতে ফিরলে ওর পছন্দের রান্নাবান্না করব। ছেলে-মেয়ে দুজনেই খেলাধুলো নিয়ে থাকুক। সেজন্য যত কষ্ট করতে হয় আমরা করব।’ প্রসঙ্গত ভারোত্তোলনে এখনও পর্যন্ত অলিম্পিক গেমসে কোনও ভারতীয় পুরুষ প্রতিযোগী পদক জিততে পারেননি। ২০০০ সালে সিডনি অলিম্পিকে প্রথম মহিলা ভারতীয় হিসেবে ব্রোঞ্জ জেতেন কর্ণম মালেশ্বরী। এরপর ২০২০ সালে টোকিও অলিম্পিকে রুপো পান মীরাবাই চানু। ‘এই তালিকাতেই একদিন নিজেকে দেখতে চাই’-কমনওয়েলথে পদক জেতার পর ফোনে এই স্বপ্নের কথাই প্রথম বলেছিল কোয়েল।