ভূমি ব্যতিরেকে যেমন অবস্থান করিবার স্থান থাকে না, আর যেমন জল বিনা পিপাসা শান্তির আর কোন উপায় হয় না, যেমন সূর্য্য ব্যতিরেকে আর কেহ অন্ধকারনাশকারী হইতে পারে না, আর যেমন অগ্নিবিহনে কোন কিঞ্ছু পাক করা সম্ভব হয় না, মাতৃগর্ভ ব্যতিরেকে যেমন জন্মগ্রহণ করা সম্ভব হয় না, হে দেবি! তেমনই তত্ত্বজ্ঞান ব্যতিরেকে মুক্তিলাভ করাও সম্ভব হয় না।
জ্ঞানলাভ হইলেই কামাদি রিপুগণ বিলীন হইয়া থাকে, ইহার অন্যথা হয় না। সমস্ত তত্ত্বের অভাব, অর্থাৎ নাশ হইলে অনন্তর আমার তত্ত্ব প্রকাশিত হইয়া থাকে।
যেমন অমৃতের দ্বারা পরিতৃপ্ত ব্যক্তির আর আহারের প্রয়োজন হয়
না, তেমনি, হে দেবি! তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তিরও শাস্ত্রাদির প্রয়োজন হয় না।
ততকাল পর্য্যন্ত তপস্যা, ব্রতাচরণ, তীর্থ, সেবা, জপ, হোম, পূজা প্রভৃতি এবং বেদ ও তন্ত্রশাস্ত্র প্রভৃতির কথা সমালোচনা করিতে হয়, যতকাল
পর্য্যন্ত তত্ত্বজ্ঞান লাভ না হয়; তত্ত্বজ্ঞান লাভ হইলে এসমস্তের কোন কিছুই প্রয়োজন থাকে না।
দেহবুদ্ধির দ্বারা আমি তোমার দাস, আর জীববুদ্ধিতে আমি তোমার অংশ, এবং আত্মবুদ্ধিতে তুমিই আমি অর্থাৎ তোমাতে এবং আমাতে অভেদ—আমার এই বুদ্ধিই স্থির।
হে শম্ভো! দেহদৃষ্টিতে আমি তোমার দাস, আর জীবদৃষ্টিতে আমি তোমার অংশ। হে আত্মন্! আত্মদৃষ্টিতে তুমি সকলেরই; সকল শাস্ত্রেই এইপ্রকার নিশ্চিত হইয়াছে।
দেহবুদ্ধিযুক্ত আমি তোমার একজন বিশিষ্ট দাস, আর হে প্রভো! জীবদৃষ্টিতে আমার তোমার অংশত্বই ব্যক্ত হয়। যখন আমার মোহ নষ্ট হইয়া আত্মজ্ঞানের প্রকাশ হয়, তখন আমি আমাতে সেই একমাত্র প্রসিদ্ধ তোমাকে দেখিতে পাই, অথবা তোমাতে আমাকে দেখিতে পাই।
এক সম্প্রদায় ‘আমি’ তোমার বলিয়া তোমার ভজনা করেন, আর এক সম্প্রদায় ‘তুমি আমার’ বলিয়া ভজনা করেন। এ বিষয়ে অল্প বৈশিষ্ট্য থাকিলেও পরিণাম দুইয়েরই সমান।
যাঁহার প্রাণ, ইন্দ্রিয়বর্গ, মন ও বুদ্ধির বৃত্তিসমূহ সঙ্কল্পশূন্য হয়, তিনি দেহে অবস্থিত হইয়াও সেই দেহ ধর্ম্ম হইতে মুক্ত বলিয়াই পরিজ্ঞাত হইয়া থাকেন।
মনই মনুষ্যের বন্ধন এবং মুক্তির কারণ। বিষয়াসক্ত মন বন্ধনের জন্য হইয়া থাকে এবং বিষয়াসক্তিরহিত মন মুক্তির জন্য অভিহিত হইয়া থাকে।
বিষয়সমূহে বৈরাগ্যই মুক্তি এবং বিষয়-রসই বন্ধন—ইহাই জ্ঞান; তোমার যাহা ইচ্ছা, তাহা কর।
যখন চিত্ত কিছু ইচ্ছা করে বা কোন কিছুর জন্য শোক করে, কিছু পরিত্যাগ করে, কিছু গ্রহণ করে, কিছু আনন্দ উপভোগ করে বা কিছু রুষ্ট হয়, তখনই চিত্তের বন্ধন হইয়া থাকে।
যখন চিত্ত কিছু বাঞ্ছা করে না, কিছুর জন্য শোক করে না, কিছু পরিত্যাগ করে না, কিছু গ্রহণ করে না, আনন্দিত বা ক্রুদ্ধ হয় না, তখনই মুক্তি হইয়া থাকে।কোন কিছু দ্রষ্টব্য পদার্থে যখন দৃষ্টি আসক্ত হয়, তখন চিত্তের বন্ধন হইয়া থাকে; আর যখন সমস্ত দ্রষ্টব্য পদার্থে চিত্ত আসক্ত হয় না, তখনই মুক্তি হয় বলিয়া জানিবে।
যখন চিত্ত অহঙ্কারমুক্ত হইয়া থাকে, তখন মুক্তি হয়; আর যখন অহঙ্কারভাব থাকে, তখনই বন্ধন হইয়া থাকে—ইহা মনে করিয়া কিছু গ্রহণ বা পরিত্যাগ, কোন কিছুই করিবে না।
স্বামী শংকরানন্দ সংকলিত ‘রত্নমালা’ থেকে