Bartaman Logo
২৯ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

কিরণ এক সূর্যের নাম

ছিলেন অন্য পেশায়। জীবন এনে দাঁড় করিয়েছে আর এক অচেনা চ্যালেঞ্জের সামনে। সাফল্য এসেছে সেখানেও। পেশার বাঁক বদলে নতুন পথেও জয়ী হলেন যাঁরা, তাঁদের নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিভাগ। এই পর্বে ভারতের প্রথম মহিলা আইপিএস অফিসার কিরণ বেদী। টেনিসে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হোক বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের লেকচারারের দায়িত্ব সাফল্য এসেছে সর্বত্র।

কিরণ এক সূর্যের নাম
  • ২৯ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কনট প্লেসের মোড়ে দাঁড়িয়ে দরদর করে ঘামছিলেন সাব-ইন্সপেক্টর নির্মল সিং। হাত কাঁপছিল তাঁর। আর কোনো উপায় না দেখে ওয়ারলেসের বোতামটা চাপলেন। খড়খড়ে আওয়াজ তুলে ওপাশ থেকে এক শান্ত দৃঢ় নারী কণ্ঠ ভেসে এল, ‘বলুন কন্ট্রোল, কী রিপোর্ট?’

Advertisement

নির্মল সিং ঢোক গিলে নিয়ে নীচু স্বরে বললেন, ‘ম্যাম, একটা বড়ো সমস্যা হয়েছে। কস্তুরবা গান্ধী মার্গে নো-পার্কিং জোনে একটা সাদা অ্যাম্বাসেডর আটকেছিল। ট্রাফিক জ্যাম বাড়ছিল দেখে আমরা ওটাতে ক্রেন লাগিয়ে দিয়েছি। কিন্তু...’
‘কিন্তু কী নির্মল?’ ওপাশের কণ্ঠস্বরে কোনো দ্বিধা নেই।
‘গাড়িটার সামনে পিএমও-র স্টিকার লাগানো। প্রধানমন্ত্রীর প্রোটোকল কনভয়ের গাড়ি! লোক জড়ো হয়ে গিয়েছে। ওপরের কর্তারা জানতে পারলে চাকরিটাই থাকবে না ম্যাম। এখন কী করব? ক্রেন খুলে দেব?’ নির্মলের গলায় টেনশনের ছাপ স্পষ্ট।
কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। ওয়ারলেসের ওপাশে থাকা অফিসার নিজের টেবিলের ফাইলটা বন্ধ করলেন। মাউথপিসটা মুখের কাছে এনে তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘গাড়িটা কার, সেটা ট্রাফিক আইনের বইতে কোথাও লেখা থাকে না। আইন সবার জন্য এক। ক্রেন খুলবে না। গাড়ি সোজা থানায় নিয়ে যাও।’
‘কিন্তু ম্যাম, যদি পিএমও থেকে চাপ আসে? ওরা তো আমাদের...’ নির্মল প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন।
‘ওপর মহলের চাপ সামলানোর জন্য আমি আছি।’ ওপাশ থেকে জবাব এল, ‘তুমি শুধু তোমার ডিউটি কর। কার‌ও সামনে মাথা নোয়াবে না। যা হবে, আমি বুঝে নেব। ওভার অ্যান্ড আউট।’
ওয়ারলেসটা কেটে গেল। নির্মল সিং একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেটে ওয়াকিটকিটা রাখলেন। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে ক্রেন চালককে চিৎকার করে বললেন, ‘গাড়ি ঘোরাও! সোজা থানায় চল!’
থানায় গাড়ি আসতেই ওপর মহলের ফোনের বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু সেই নারী নিজেই ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে জরিমানা আদায় করেই গাড়ি ছাড়েন। এরপর অবশ্য দিল্লির ট্রাফিক ডিসিপি পদ থেকে গোয়ায় বদলি হতে হয় ভারতের প্রথম মহিলা আইপিএস অফিসার কিরণ বেদীকে। তিনি ‘ক্রেন বেদী’ নামে সকলের কাছে পরিচিতি পান। শোনা যায় পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পুলিশের কর্তাদের বলেছিলেন, ‘আইন তো আইনই, ট্রাফিক পুলিশ ঠিক কাজই করেছে।’
অবশ্য এ নতুন নয়, ছোটোবেলা থেকেই তিনি লড়াকু মানসিকতার। কিরণ যখন খুব ছোটো তখন থেকেই তাঁর বাবা মেয়েকে টেনিস কোর্টে নিয়ে যেতেন। বাবা প্রকাশ লাল পেশোয়া ছিলেন অমৃতসরের একজন টেনিস খেলোয়াড়। তাই তিনি তাঁর চার মেয়েকেও সেইভাবে বড়ো করতে চেয়েছিলেন। কিরণ‌ও ছোটোবেলায় টেনিসেই কেরিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। সেই সময় অমৃতসরের রক্ষণশীল সমাজে যেখানে অন্য মেয়েরা ঘরের বাইরে বের হতে দ্বিধা করত, সেখানে কিরণ ছোটো করে চুল কেটে, হাফপ্যান্ট পরে ছেলেদের সঙ্গে টেনিস কোর্টে দাপিয়ে বেড়াতেন। বাবা প্রকাশলাল ভোর চারটের সময় চার মেয়েকে সাইকেলে করে নিয়ে যেতেন অমৃতসরের সার্ভিস ক্লাবে। বাবা‌-ই কিরণকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে ফোরহ্যান্ড ও ব্যাকহ্যান্ড শট নিতে হয়। আর শিখিয়েছিলেন কীভাবে প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে চাপে রাখতে হয়। যা পরবর্তী জীবনেও তাঁর কাজে লেগেছিল। অমৃতসরের গভর্নমেন্ট কলেজ ফর উইমেনে পড়ার সময়ই বিভিন্ন টুর্নামেন্টে আধিপত্য বিস্তার করেন। পাঞ্জাব এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্টেট-লেভেল টুর্নামেন্টে তিনি সিঙ্গেল এবং ডাবলসে চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৬৬ সালে তিনি জাতীয় জুনিয়র লন টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ, ১৯৬৮ সালে অল ইন্ডিয়া ইন্টারভার্সিটি চ্যাম্পিয়নশিপ, ১৯৭০ সালে উত্তর ভারত চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ১৯৭২ সালে এশিয়ান লন টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন। তারপর ২৭ বছর বয়সে ১৯৭৬ সালে তিনি ন্যাশনাল উইমেন টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। এটাই তাঁর টেনিসে সবথেকে বড়ো অর্জন।
এর পাশাপাশি কিরণ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী। খেলাধুলার চরম ব্যস্ততার মাঝেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন। এরই মাঝে চণ্ডীগড়ের ডি.এ.ভি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের লেকচারার হিসেবে যোগ দেন।
টেনিসে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর পারফরম্যান্স সাড়া ফেলেছিল, এমনকি উইম্বলডনে খেলার সুযোগও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ে ভারতে মহিলা খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ কোনো স্পন্সরশিপ বা সরকারি আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা ছিল না। বিদেশ সফরের বিপুল খরচ বহন করা কিরণের পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। সরকারি দপ্তরে বহুবার আবেদন করেও কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায়, উইম্বলডনে খেলার স্বপ্ন চিরতরে বিসর্জন দিতে হয়।
এই ঘটনাই কিরণের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন ‘সিস্টেম’ পরিবর্তনের জন্য তাঁকে সিস্টেমের অংশ হতে হবে। তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন এবং ১৯৭২ সালে তিনি এই কঠিন পরীক্ষায় সফল হন। এরপর দীর্ঘ প্রশিক্ষণের ধাপ পেরিয়ে ১৯৭৫ সালে তিনি ভারতের প্রথম মহিলা আইপিএস অফিসার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
টেনিসে সাফল্যের মতোই তাঁর আইপিএস অফিসারের কর্মজীবন আর‌ও বেশি আলোচিত। ক্রেন বেদী নামে পরিচিত হ‌ওয়ার কথা তো আগেই উল্লেখ করেছি। কিরণ তিহার জেলের পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থাই বদলে ফেলেন। অপরাধীদের সংশোধনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি সেখানে যোগব্যায়াম, মেডিটেশন ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন, যা ‘তিহার মডেল’ নামে পরিচিত।
কিরণ বেদী বারবার বদলি হয়েছেন, অনেক সময় রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে, কিন্তু তিনি নিজের মেরুদণ্ড কখনোই বাঁকা করেননি। যেখানেই গিয়েছেন, তিনি দুর্নীতি দমন ও জনসেবাকেই মূল লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছেন। পুলিশি কর্মকাণ্ডে তিনি সবসময় আধুনিকতা ও মানবিকতার সমন্বয় চেয়েছিলেন। ২০১১ সালে ইউপিএ সরকারের দুর্নিতির বিরুদ্ধে আন্না হাজারের আন্দোলনেও বেদী যোগ দিয়েছিলেন।
আইপিএস অফিসার হিসেবে তিনি অসংখ্য সম্মান পেয়েছেন। ১৯৮২ সালে দিল্লি ট্রাফিক পুলিশের উপ-কমিশনার থাকাকালীন সাহসিকতার জন্য তিনি প্রেসিডেন্টস পুলিশ মেডেল পান। এছাড়া ১৯৯৪ সালে ফিলিপিন্স সরকার তাঁকে এশিয়ার নোবেলখ্যাত রামোন ম্যাগসেসে পুরস্কার প্রদান করে।
কিরণ বেদী জাতিসংঘের পুলিশ অ্যাডভাইজার হিসেবেও কাজ করেছেন। 
দীর্ঘদিনের সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরের পর কিরণ এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকেননি। ভারতের সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ২০১৫ সালের দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে কিরণ বেদী বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে লড়েছেন। এর ঠিক পরের বছরই, তাঁকে পুদুচেরির লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। সেখানেও তিনি মানুষের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। কিরণ বেদী যেই পেশাতেই গিয়েছেন, সেখানেই নিজের ‘কিরণ’ ছড়িয়েছেন। কিরণ বেদী, এক সূর্যের নাম।
শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ