Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

খাল কেটে কুমির নয়, ঘরে বউ এনেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র, সঙ্কটে রানাঘাটের ঐতিহাসিক বাচকো খাল

খাল কেটে কুমির নয়, ঘরে বউ এনেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র, সঙ্কটে রানাঘাটের ঐতিহাসিক বাচকো খাল
  • ৪ নভেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: কারও জন্য মন ভাঙলে কষ্টে মানুষের মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে, ‘খাল কেটে কুমির এনেছিলাম।’ সেই প্রাচীন প্রবাদ আজও অচল হয়ে যায়নি। কিন্তু, এই বাংলারই এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব খাল কেটে কুমির নয়, বউ এনেছিলেন ঘরে! রানাঘাটের বুকেই রয়েছে সেই ঐতিহাসিক খাল, যা নাকি স্বয়ং মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র কাটিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের প্রবাহে বৃদ্ধ হয়েছে সেই খাল। রুগ্ন দশা আর দূষণে আজ লোক মুখে ফেরে একটাই প্রশ্ন, ‘বাচকো আর বাঁচবে তো?’
Advertisement
ইতিহাস বাঁচানোর প্রশ্নে বাঙালির বরাবরের উদাসীনতা। রানাঘাটের ধার ঘেঁষে বয়ে চলা বাচকো খাল তারই জলজ্যান্ত উদাহরণ। অথচ একদিকে যেমন এই খালের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম, তেমনই রানাঘাট, কুপার্স ক্যাম্পের মতো জনবহুল এলাকাগুলির নিকাশির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অথচ খালের দূষণ এবং ঢালাও সংস্কারের অভাব ক্রমশ রুগ্ন করেছে ইতিহাস সম্পৃক্ত এই খালটিকে। অবশ্য বাচকো নিয়ে ইতিহাস বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত রয়েছে। তাঁদের মধ্যে একাংশ মনে করেন বাচকো একসময় নদী ছিল, যা পরবর্তীতে খালে পরিণত হয়। যদিও মরা নদীখাত ব্যাহত করে পরবর্তীতে খাল কাটার উদাহরণ বাংলা থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে ছত্রে ছত্রে রয়েছে। বহু ইতিহাসবিদ আবার তাঁদের গবেষণায় পেয়েছেন, এই খাল কেটেছিলেন স্বয়ং মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র। কিন্তু মন্দির-ইমারত-অট্টালিকা ছেড়ে, খামোকা আস্ত একটা খাল কাটার পিছনে কারণটা ঠিক কী ছিল? সূত্রসন্ধানে মেলে এক মৃদু প্রেমের কাহিনিও। নদীয়ার ঐতিহাসিক তাপস বন্দ্যোপাধ্যায তাঁর ‘উনিশ শতকের রানাঘাট’ বইটিতে লিখছেন, নোকাড়ির এক ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ের রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র। দেখা মাত্রই নদীয়াপতি ঠিক করেন, বিয়ে করবেন সেই ব্রাহ্মণকন্যাকে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল যাতায়াতে। শেষ পর্যন্ত, নিরাপত্তা এবং সেযুগে নদীপথে যোগাযোগের সুবিধা অনুধাবন করে ঠিক হল, গঙ্গা হয়ে মহারাজ আসবেন চূর্ণী নদীতে। তারপর সেখান থেকে নোকাড়ি আসার জন্য একটা খাল কাটা হবে। বলা ভালো, কৃষ্ণচন্দ্রের দ্বিতীয় বিবাহের ইচ্ছাপূরণে কাটা হয় আজকের এই বাচকো খাল। শেষ পর্যন্ত, ওই খাল পথেই দ্বিতীয় বিবাহ করে ঘরে বউ এনেছিলেন নদীয়াপতি। 
আবার রামানুজ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বৃহত্তর রানাঘাট: সেকাল একাল’ বইতেও উল্লেখ মেলে এই ঘটনার। খানিক ভিন্ন সুরে তাতে লেখা, একসময় এই খাল কেটেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র। একবার সেই জলপথে যাতায়াতের সময় নোকাড়িতে প্রথমবার ব্রাহ্মণ কন্যাকে দেখেছিলেন মহারাজ। তারপর বিয়ে করতে একসময় নিজের কাটানো খালেই নোকাড়ি এসেছিলেন তিনি। অর্থাৎ বলাই বাহুল্য, প্রবাদের মতো খাল কেটে কুমির নয়, ঘরে বউ এনেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র। ভাবা যায়! তাই কোথাও যেন মিলেমিশে যায়, বাংলার প্রাচীন প্রবাদ ও কৃষ্ণচন্দ্রের কাণ্ড কারখানা। সেই সঙ্গে যেন অনায়াসেই বলা চলে, শাহজাহানের তৈরি তাজমহলের মতোই, অখ্যাত বাচকো যেন আরও এক নিবিড় ভালবাসার উদাহরণ। কিন্তু ইতিহাস তার মর্যাদা দিল কই? 
বর্তমানে, এই বাচকো খাল রানাঘাট, নোকাড়ি এবং কুপার্স ক্যাম্প সহ একাধিক এলাকার নিকাশির অন্যতম ভরসা। কিন্তু লাগাতার দূষণে ক্রমশ নাব্যতা কমছে তার। একদিন হয়তো এভাবেই আরও সংকীর্ণ হয়ে যাবে বাচকো। তার সঙ্গেই হয়তো হারিয়ে যাবে এক রাজকীয় প্রেমের ইতিহাস।
সম্পর্কিত সংবাদ