সংবাদদাতা, কাটোয়া: কাটোয়া মহকুমাজুড়ে স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়ছে। করোনাকাল থেকেই মাধ্যমিক পরীক্ষা না দিয়ে ভিনরাজ্যে কাজের সন্ধানে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছিল। সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে। পড়ুয়া খুঁজতে বাড়ি বাড়ি যেতে হচ্ছে শিক্ষকদের। লক্ষ্য স্থির রেখে স্কুলে গেলে সাফল্যের শিখরে পৌঁছনো যায়। সদ্য প্রকাশিত মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় কাটোয়ার গ্রাম-বাংলার পড়ুয়ারাই তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
কাটোয়ার কৃতীরা বলছে, হাল ছাড়লে হবে না। স্কুলের ক্লাসে গুরুত্ব দিতে হবে। অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন খোদ রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের উপসচিব পার্থ কর্মকার। তিনি বলেন, গ্রাম-শহর বলে আলাদা কিছু নেই। লক্ষ্য স্থির রাখতে হবে। কঠিন অধ্যবসায়ী হতে হবে। আর প্রতিদিন স্কুলের ক্লাসে অংশ নিতে হবে। তাহলেই সাফল্য ধরা দেবে। কাটোয়ার কাশীরাম দাস বিদ্যায়তন একটানা ১১বছর ধরে রাজ্যের মেধাতালিকায় স্থান পাচ্ছে। পড়ুয়ারা কেউ মাধ্যমিকে, আবার কেউ উচ্চ মাধ্যমিকের মেধাতালিকায় স্থান পেয়ে স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করেছে। শুধু তাই নয়, গ্রামের স্কুল মেঝিয়ারি সতীশচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ও গত বছর মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছিল। এবছর কেতুগ্রামের নিরোল উচ্চ বিদ্যালয়, মঙ্গলকোটের কাশেমনগরের বিএনটিপি গার্লস হাইস্কুল, আউশগ্রামের অমড়াগড় উচ্চ বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারাও মেধাতালিকায় স্থান পেয়েছে। অথচ গ্রামীণ স্কুলগুলিতে শিক্ষকের সংখ্যা কম। স্কুলছুটের সংখ্যাও বাড়ছে। ক্লাসের পঠনপাঠনকে অনেকেই গুরুত্ব দিতে চাইছে না। কেতুগ্রামের নিরোল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র মহম্মদ সেলিম এবার মাধ্যমিকে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে। সে বলে, আমি প্রতিদিন স্কুলে যেতাম। স্কুলের শিক্ষকদের পড়ানো শুনতাম। তাই সকলের উদ্দেশেই বলছি, লক্ষ্য স্থির রেখে প্রতিদিন স্কুলে যেতে হবে। প্রধান শিক্ষক দিব্যেন্দু হাজরা বলেন, স্কুলছুটের সংখ্যা এখন বেড়েছে। অভিভাবকদের এবার সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। সেলিম প্রতিদিন স্কুলে আসতো। স্কুলে আলাদা ক্লাস হতো। স্কুলকে গুরুত্ব দিলে যে মেধাতালিকায় আসা যায়, সেলিমকে দেখেই আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি। এখন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের রমরমা। তাই অনেকেই সেদিকে ঝুঁকছেন। কাটোয়ার তিনটি বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ুয়ার যা সংখ্যা, সেই তুলনায় সরকারি স্কুলে কম। অথচ সরকারি স্কুলে পড়েও যে উন্নতির শিখরে পৌঁছনো যায় কাটোয়ার দেবদত্তা মাজি জয়েন্টে দেশের সেরা হয়ে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। কাটোয়ার দুর্গাদাসী চৌধুরানী বালিকা বিদ্যালয় থেকেই দেবদত্তা পড়াশোনা করেছেন। মঙ্গলকোটের ক্ষীরগ্রাম যোগাদ্যা বাণীপীঠের প্রধান শিক্ষক প্রসেনজিৎ গুপ্ত বলেন, আমাদের স্কুলে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছিল। সেজন্য আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়ে এসেছি। অনেকেই ভাবেন, স্কুলে না এসে প্রাইভেট টিউশন দিলেই ছেলেমেয়ে ভালো ফল করবে। কিন্তু সদ্য প্রকাশিত মেধাতালিকা দেখে অভিভাবকদের একটু সচেতন হওয়া দরকার। মঙ্গলকোটের কাশেমনগরের ছাত্রী দশম স্থানাধিকারী স্বাগতা সরকারও একই পরামর্শ দিচ্ছে। তার কথায়, স্কুলে শিক্ষকরা যত্নবান হয়েই পড়াশোনা শেখান। তাই প্রতিদিন স্কুলে যেতেই হবে। কাটোয়ার দুর্গাদাসী চৌধুরানি উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা মেধা তালিকায় স্থান পেতে শুরু করে ২০১২ সাল থেকে। একটানা বেশ কয়েক বছর ধরে এই স্কুলের ছাত্রীরা মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছিল। তাই স্কুলে ফাঁকি দিয়ে ভিনরাজ্যে কাজে যাওয়ার প্রবণতা কমলেই বাংলার ছেলেমেয়েরা শিক্ষাক্ষেত্রে আরও এগিয়ে যাবে। এমনটাই বলছেন শিক্ষানুরাগীরা।