সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: আসানসোলে থেকেও যেন পাক গোলার আওয়াজ শুনতে পান ওঁরা। এই বুঝি আছড়ে পড়ল বাড়ির উপর! সবকিছু ধুলিসাৎ। হয়তো প্রিয়জনের মৃত্যু! সর্বক্ষণ আতঙ্ক। বাড়ি থেকে প্রায় এক হাজার ৮০০ কিলোমিটার দূরে এসেও ওঁদের শান্তি নেই। পেহেলগাঁওয়ে জঙ্গিদের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রত্যাঘাত ঘিরে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ পরিস্থিতির কয়েকটা দিন চরম দুঃশ্চিন্তায় কেটেছে সবার। ওঁদের একজন নবীন কৌশর। বাড়ি রাজৌরি। কৌশরের বাড়ির সামনে পড়েওছিল একটা পাক গোলা। বরাত জোরে রক্ষা পান তাঁর পরিজনরা। বারবার দু’দেশের মধ্যে এই অস্থিরতা, যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব আর ভালো লাগে না ওঁদের। ওঁরা এখন মনেপ্রাণে চান, শত্রু দেশের বিষ দাঁত একেবারে উপড়ে ফেলতে। পাকিস্তানের লালিত জঙ্গিরা যাতে কোনওভাবে ভারতের নীরিহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার সাহস না পায়। পেহেলগাঁওয়ের কঠোর প্রতিশোধ চান ওঁরা।
ওঁরা বলতে এগারোজন তরুণী। সকলেই কাশ্মীরি কন্যা। আসানসোল ইএসআই নার্সিং কলেজে ওঁরাই যেন এক টুকরো কাশ্মীর। নার্সিং ট্রেনিং নিতে এসেছেন সবাই । কারও বাড়ি রাজৌরি কারও আবার জম্মুতে। বর্তমান ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে কাশ্মীরি কন্যাদের রা একটাই—‘যুদ্ধ বিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করলে ভারত যেন শত্রু দেশকে সুদে-আসলে মিটিয়ে দেয়। এমন চরম শিক্ষা দেওয়া হোক পাকিস্তান যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।’
শনিবার ছিল আসানসোল ইএসআই নার্সিং কলেজ অডিটোরিয়ামে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। দুঃস্থ রোগীদের শ্রবণ যন্ত্র তুলে দেওয়া হয়। হাজির ছিলেন নেতা মন্ত্রী থেকে সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষজন। সেজেগুজে হাজির কলেজের ভবিষ্যতের ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল’রা। ওই এগারোজন কাশ্মীরি কন্যাও ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু চোখে-মুখে ছিল উদ্বেগের ছাপ। অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েও তাঁদের মন ছিল বিচলিত। সেই উদ্বেগ নিয়ে এদিনই গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে সকলেই সন্ধ্যার ট্রেনে রওনা দিয়েছেন বাড়ির উদ্দেশে।
নবিন কৌশরের বাড়ি পাক সীমান্ত লাগোয়া রাজৌরিতে। বাবা জম্মু ও কাশ্মীর পুলিসের অফিসার ছিলেন। কৌশর বলছিলেন, ‘আমার বাড়ির সামনেই পাকিস্তানের গোলা এসে পড়েছিল। বাড়িটি বেশ ক্ষতি হয়েছে। আমরা চাই কাশ্মীরে শান্তি ফিরুক। কিন্তু সন্ত্রাসবাদীরা আমাদের শান্তিতে থাকতে দিতে চায় না। আমরা চাই ওঁদের সমূলে নিকেশ করতে।’ সহপাঠী অনামিকা শর্মা বলেন, ‘পাকিস্তান হুঁশিয়ারি দিচ্ছে সিজ ফায়ার নাকি ১৮ মে পর্যন্ত। তারপর যদি ওরা গোলা-গুলি ছোড়ে আমাদের সেনা যেন দেশটাকেই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দেয়। ছোট থেকেই উদ্বেগ নিয়ে বড় হচ্ছি। এটার শেষ হওয়া প্রয়োজন।’
আর এক পড়ুয়া স্বপ্না দেবী বলেন, ‘যখন যুদ্ধ চলছিল আমরা রাতে ঘুমোতে পারিনি। বাড়ি লোকের কাছে খবর নিতাম, তাঁরা ঠিকঠাক রয়েছেন তো। ওদের আর বরাদাস্ত করা যাবে না।’
জম্মুর মেয়ে সালিনি বলেন, ‘আমরা সেবিকা হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। অহিংসাই আমাদের ধর্ম। কিন্তু কেউ আপনার বাড়িতে এসে মেরে চলে গেলে আপনি ক্ষমা করতে পারেন না। পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।’ নার্সিং পড়ুয়া ফতিমা নিশা অবশ্য বলছিলেন, ‘দু’তরফেই গোলাগুলি বন্ধ করা বাঞ্ছনীয়।’ কাশ্মীরি তরুণীরা। নিজস্ব চিত্র