একদিন শ্রীশ্রীঠাকুর ভাবে সোনার অন্নপূর্ণার দর্শন করেছিলেন। এই সোনার অন্নপূর্ণার কথা ‘কাশীখণ্ড’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, কিন্তু সাধারণ লোকের তা দৃষ্টিগোচর হয় না। ‘কাশীখণ্ড’ গ্রন্থে লেখা আছে যে, যে কাশীতে মৃত্যু হলে শিব নির্বাণ মুক্তি দেন এবং সে জীবের আর দেহধারণ করতে হয় না। কিন্তু এ বিষয়ে কিভাবে শিব মুক্তি প্রদান করেন, সে কথা কোথাও উল্লেখ নাই এবং এ পর্যন্ত কেউ এ সম্বন্ধে কিছুই দেখেননি বা জানতেন না। কিন্তু শ্রীশ্রীঠাকুর এ বিষয়ে স্বচক্ষে যা দর্শন করেছেন ও বর্ণনা দিয়েছেন, সে এক অদ্ভুত কাণ্ড। এই সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুরের নিজের কথা—“দেখলাম পিঙ্গলবর্ণ জটাধারী দীর্ঘকায় এক শুভ্রকান্তি পুরুষ গম্ভীর পদবিক্ষেপে শ্মশানে (মণীকর্ণিকা ঘাটের শ্মশানে) প্রত্যেক চিতার পার্শ্বে আগমন করছেন এবং প্রত্যেক দেহীকে সযত্নে উত্তোলন করে তার কর্ণে তারকব্রহ্ম মন্ত্র প্রদান করছেন। সর্বশক্তিময়ী শ্রীশ্রীজগদম্বাও স্বয়ং মহাকালীরূপে জীবের অপরপার্শ্বে সেই চিতার ওপর বসে তার (জীবের) স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ প্রভৃতি সকলপ্রকার সংস্কার বন্ধন খুলে দিচ্ছেন এবং নির্বাণের দ্বার উন্মুক্ত করে স্বহস্তে তাকে অখণ্ডের ঘরে প্রেরণ করছেন। এইরূপ বহুকল্পের যোগ-তপস্যায় যে অদ্বৈতভাবের ভূমানন্দ জীবের এসে উপস্থিত হয়, শ্রীশ্রীবিশ্বনাথ তা সদ্য সদ্য প্রদান করে কৃতার্থ করছেন।” শ্রীশ্রীঠাকুরের এইরূপ দর্শনের কথা শুনে ওখানকার পণ্ডিতেরা বলতে লাগলেন, ‘কাশীখণ্ডে’ মোটামুটিভাবে লেখা আছে, “এখানে মৃত্যু হলে ঁবিশ্বনাথ জীবকে নির্বাণ পদবী দিয়ে থাকেন; কিন্তু কিভাবে যে তা দেন তা সবিস্তার লেখা নেই। আপনার দর্শনে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তা কিরূপে সম্পাদিত হয়! আপনার দর্শনাদি শাস্ত্রের লিপিবদ্ধ কথার পারে চলে যায়।”
শ্রীঠাকুর কাশীতে ত্রৈলঙ্গস্বামীকেও দর্শন করেছিলেন। তাঁর সম্বন্ধে ঠাকুর বলেছিলেন, “দেখলাম, সাক্ষাৎ বিশ্বনাথ, তাঁর (ত্রৈলঙ্গস্বামী) শরীরটা আশ্রয় করে প্রকাশিত হয়ে রয়েছেন।” এইভাবে শ্রীশ্রীঠাকুর কাশী বাসকালে কাশী সম্পর্কে যত ধর্মগ্রন্থে যা যা বর্ণিত আছে, সে সমস্ত স্বচক্ষে দর্শনও করেছিলেন। তাছাড়াও শ্রীবিশ্বনাথের ঠাকুরের নিজের দেহে প্রবেশ এবং সাক্ষাৎ শিব ও মহাকালী জীবকে সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত করে নির্বাণপদে পৌঁছে দেওয়ার দর্শন ইত্যাদির দ্বারা ‘শ্রীরামকৃষ্ণ রঙের গামলা’য় মহাতীর্থ কাশীর যে সমস্ত মাহাত্ম্য বিদ্যমান, তা বোঝা যায়।
এবার শ্রীশ্রীঠাকুরের বৃন্দাবন তীর্থদর্শন। শ্রীবৃন্দাবনে বাঁকাবিহারী মূর্তি দর্শন করে ঠাকুরের তথায় অদ্ভুত ভাবাবেশ হয়েছিল। আত্মহারা হয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করতে ছুটে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যাবেলায় রাখালবালকেরা গরুর পাল নিয়ে যমুনা পার হয়ে গোচারণ হতে ফিরছে দেখতে দেখতে তাদের ভেতর ময়ূরপুচ্ছধারী গোপাল-কৃষ্ণের দর্শন লাভ করে তিনি প্রেমে বিভোর হয়েছিলেন।


