Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

কালীপুজোর রাতে অন্ধকারে থাকে নলহাটির ভদ্রপুরের মহিরাবণ কালী

সারাবছর পুজিত হয়ে আসলেও কালীপুজোয় কোনও পুজো পান না নলহাটির ভদ্রপুরের মহিরাবণ কালী ও আকালিপুরের মগধের রাজা জরাসন্ধের গুহ্যকালী।

কালীপুজোর রাতে অন্ধকারে থাকে নলহাটির ভদ্রপুরের মহিরাবণ কালী
  • ১৮ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, রামপুরহাট: সারাবছর পুজিত হয়ে আসলেও কালীপুজোয় কোনও পুজো পান না নলহাটির ভদ্রপুরের মহিরাবণ কালী ও আকালিপুরের মগধের রাজা জরাসন্ধের গুহ্যকালী। কালীপুজোর নিশিরাতে যখন উৎসবে মেতে ওঠে আপামর বাঙালি, কালী মন্দিরগুলি আলোর রোশনাইয়ে সেজে ওঠে, তখন অন্ধকারে ডুবে থাকে এই দুই কালী মন্দির। 

Advertisement

ব্রহ্মাণী নদীর পাড়ের ভদ্রপুর গ্রাম আগে জঙ্গলময় ছিল। মহারাজ নন্দকুমারের পুরোহিত জয়কৃষ্ণ চক্রবর্তী এখানে মহিরাবণ কালীর প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করেন। মন্দিরের প্রবীণ সেবাইত সুপ্রিয় চট্টোপাধ্যায় বলেন, কোথা থেকে কীভাবে এই মূর্তি এখানে এসেছে তা জানা নেই। তবে একই মূর্তি রয়েছে অযোধ্যা পাহাড়ে। দু’টিই কষ্টিপাথরের। জনশ্রুতি রয়েছে, আগে নিশিরাতে কালীপুজো হতো। নিঃশব্দে পুজো হওয়ায় রীতি ছিল এখানে। কিন্তু কোনও একটা সময় অমাবস্যার নিশিরাতে পুজো চলাকালীন একটি হনুমান বাজনা বাজিয়েছিল। তারপর থেকেই মহিরাবণের ধ্বংস শুরু হয়। সেই থেকে কালীপুজোর সময় এখানে মায়ের কোনও পুজো হয় না। তবে নিত্য সেবা হয়। এছাড়া চতুর্দশী তিথিতে মায়ের বিশেষ পুজো হয়। কিন্তু কপাট বন্ধ করে নিঃশব্দে। পুরোহিতের মন্ত্রও উচ্চারণও কেউ যেন শুনতে না পায়। এমনকী, শঙ্খধ্বনিও নয়। থাকে না কোনও বাজনা। তন্ত্রমতে পুজো হলেও হয় না অন্নভোগ।  
অন্যদিকে, পুরাকালে বিহারের মগধের রাজা জরাসন্ধ পাতালে গুহ্যকালীর সাধনা করতেন। তখন বিহারের গয়াকে বলা হত মগধ। জরাসন্ধের মৃত্যুর পর বহুদিন মাটির নীচে থেকে যায় এই কালী। এরপর রাজস্থানের রানি অহল্যা বাই কিছুদিন মগধে আসেন। সেই সময় শিবের স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি মগধের একটি জায়গায় খনন কার্য চালিয়ে শিবলিঙ্গের পাশাপাশি একটি কষ্টি পাথরের বেদি সমেত কালীমূর্তি পান। জায়গাটি কাশীরাজ ঩চৈত্য সিংয়ের, তাই মূর্তিটি তাঁকে দিয়ে দেন। কিন্তু মূর্তিটি তদানীন্তন ইংরেজ শাসক ওয়ারেন হেস্টিংসের নজরে পড়ে যায়। তিনি ইংল্যান্ডের মিউজিয়ামে সেটি নিয়ে যেতে চান। তাই হেস্টিংসের হাত থেকে বাঁচতে রাজা চৈত্য সিং কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটের কাজে গঙ্গার জলে মূর্তিটি লুকিয়ে রাখেন। কালক্রমে মহারাজ নন্দকুমার কাশী পৌঁছন। তখন তিনি বাংলা, বিহার, ওড়িশার নবাব সিরাজদৌল্লার অধীন বাংলার দেওয়ান ছিলেন। তিনি মূর্তিটিকে গঙ্গা থেকে উদ্ধার করে জলপথে দ্বারকা নদ পেরিয়ে ব্রাহ্মণী নদীর আকালিপুর গ্রামে নিয়ে এসে একটি বটগাছের তলায় মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেন। মা এখানে জরাসন্ধের গুহ্যকালী নামে খ্যাত। 
পরবর্তী সময়ে মন্দির নির্মাণ শুরু করেন নন্দকুমার। কিন্তু মিথ্যা মামলায় নন্দকুমারকে বন্দি করে ইংরেজরা। এরপর তাঁর ছেলে গুরুদাস রায় অসম্পূর্ণ মন্দির মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৭৫ সালের ৫ আগস্ট নন্দকুমারের ফাঁসি হয়। পরে অপুত্রক অবস্থায় মারা যান গুরুদাস। এরপর মহারাজ নন্দকুমারের বাকি বংশধরেরা পুজোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। রাজ পরিবারের নির্দেশ অনুযায়ী আজও দেবীর নিত্যভোগে থাকে ভাত, একটি ভাজা, মুগের ডাল, তরকারি ও তেঁতুল দিয়ে মাছের টক। প্রাচীন রীতি অনুযায়ী, প্রতিদিন ১০ পোয়া অর্থাৎ দু’কেজি আতপ চালের ভোগ নিবেদন করা হয়। 
মন্দিরের প্রধান পুরোহিত দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, কালীপুজোর নিশি রাতে এখানে মায়ের কোনও পুজোর চল নেই। কী কারণে তা সকলের অজানা। তবে চতুর্দশী তিথি ও রটন্তী কালীপুজোয় মায়ের বিশেষ পুজো করা হয়। বহু ভক্তের সমাগম ঘটে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ