


আজ ফলহারিণী কালীপুজো। এই পুণ্যতিথিতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ মা সারদাকে ষোড়শী রূপে অর্চনা করেন। জগতে মাতৃভাবের বিকাশের জন্য মাকে কেন্দ্র করে তাঁর এই আয়োজন ছিল। লিখছেন গুঞ্জন ঘোষ।
বাংলায় প্রচলিত চতুর্ভুজা দক্ষিণা কালীমূর্তির স্রষ্টা কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। তিনি বিখ্যাত আধুনিক কালী প্রতিমার রূপকার ও দীপান্বিতা কালীপুজোর জন্য। তাঁর সৃষ্ট মূর্তিতেই ফলহারিণী কালীপুজোর যাবতীয় পুজোবিধি পালিত হয়। ফলহারিণী কালীপুজো খ্যাতি লাভ করে এই তিথিতে শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীমা সারদাকে ষোড়শী রূপে ত্রিপুরাসুন্দরীর অর্চনা করেন বলে। জগতে মাতৃভাবের বিকাশের জন্য মাকে কেন্দ্র করে তাঁর এই আয়োজন।
ঠাকুর শ্রীশ্রীজগদম্বাকে পুজো করার জন্য মন্দিরের পরিবর্তে তাঁর ইচ্ছানুসারে গুপ্তভাবে নিজের ঘরে আয়োজন করলেন। পুজোর যাবতীয় জোগাড়যন্ত্র করে দিলেন ভাগনে হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায়। তিনি চলে গেলে ঠাকুরের কাছে আসেন বিষ্ণু মন্দিরের পূজারি দিনু পুরোহিত।
মাকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন। রাত ন’টায় মা এলেন ঠাকুরের ঘরে। ঠাকুর আলপনা দেওয়া পিঁড়িতে মাকে বসতে ইঙ্গিত করলেন তাঁর আসনের দক্ষিণ দিকে। ঠাকুর নিজের হাতে মায়ের পায়ে আলতা পরিয়ে এবং তাঁকে নতুন কাপড় ও সিঁদুর দিয়ে সাজালেন।
তাঁর জীবনীকার স্বামী তেজসানন্দজির বিবরণ— ‘‘মন্ত্রমুগ্ধার ন্যায় তিনি এখন পূর্বমুখে উপবিষ্ট ঠাকুরের দক্ষিণভাগে উত্তরাস্যা হইয়া উপবিষ্টা হইলেন। সম্মুখস্থ কলসের মন্ত্রপূত বারি দ্বারা ঠাকুর বারংবার শ্রীশ্রীমাকে যথাবিধানে অভিষিক্তা করিলেন। অতঃপর মন্ত্র শ্রবণ করাইয়া তিনি এখন প্রার্থনা মন্ত্র উচ্চারণ করিলেন, ‘হে বালে, হে সর্বশক্তির অধীশ্বরী মাতঃ ত্রিপুরাসুন্দরী, সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর, ইঁহার শরীর মনকে পবিত্র করিয়া ইঁহাতে আবির্ভূতা হইয়া সর্বকল্যাণসাধন কর।’ অতঃপর শ্রীমায়ের অঙ্গে মন্ত্রসকলের যথাবিধানে ন্যাসপূর্বক ঠাকুর সাক্ষাৎ দেবীজ্ঞানে তাঁহাকে ষোড়শোপচারে পূজা করিলেন এবং ভোগ নিবেদন করিয়া নিবেদিত বস্তুসকলের কিয়দংশ স্বহস্তে তাঁহার মুখে প্রদান করিলেন।’’
গোটা এই পর্বটুকু শ্রীমায়ের কোনো হুঁশ ছিল না। পূজক শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের আসনশুদ্ধি, অঙ্গন্যাস ইত্যাদি করামাত্র অর্ধবাহ্যদশায় চলে যান। সেই মুহূর্তটি কেমন ছিল? শ্রীরামকৃষ্ণ জীবনীর বিবরণ, ‘বাহ্যজ্ঞানতিরোহিতা হইয়া শ্রীশ্রীমা সমাধিস্থা হইলেন। ঠাকুরও অর্ধবাহ্যদশায় মন্ত্রোচ্চারণ করিতে করিতে সম্পূর্ণ সমাধিমগ্ন হইলেন। সমাধিস্থ পূজক সমাধিস্থা দেবীর সহিত আত্মস্বরূপে পূর্ণভাবে মিলিত ও একীভূত হইলেন। নিশার দ্বিতীয় প্রহর বহুক্ষণ অতীত হইয়াছে। আত্মারাম ঠাকুরের এইবার বাহ্যসংজ্ঞার কিছু কিছু লক্ষণ দেখা গেল। পূর্বের ন্যায় অর্ধবাহ্যদশা প্রাপ্ত হইয়া তিনি এখন দেবীকে আত্মনিবেদন করিলেন।’
এরপর শ্রীরামকৃষ্ণ এতদিনকার যাবতীয় কঠিন ও গূঢ় সাধনার সমস্ত তপস্যার ফল সেইসঙ্গে জপের মালা শ্রীশ্রীদেবীপাদপদ্মে চিরকালের জন্য সমর্পণ করে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে শ্রীমাকে প্রণাম করলেন—‘হে সর্বমঙ্গলের মঙ্গলস্বরূপে, হে সর্বকর্মনিষ্পন্নকা, হে শরণদায়িনি ত্রিনয়নি শিবগেহিনি গৌরি, হে নারায়ণি, তোমাকে প্রণাম, তোমাকে প্রণাম করি।’ জীবনীকার লিখছেন, ‘পূজা শেষ হইল–মূর্তিমতী বিদ্যারূপিণী মানবীর দেহাবলম্বনে ঈশ্বরীয় উপাসনাপূর্বক ঠাকুরের সাধনার পরিসমাপ্তি হইল— তাঁহার দেব–মানবত্ব সর্বতোভাবে সম্পূর্ণতা লাভ করিল।’ এই দিনেই ঠাকুর তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির সমস্ত সত্তা মায়ের মধ্যে সঞ্চারিত করে মাকে ভাবীকালের উত্তরাধিকার দিলেন— আত্মনো মোক্ষার্থজগদ্ধিতায় ব্রতের শুভারম্ভ করলেন। তিনি এও দেখলেন সমস্ত জাগতিক কর্মফল জগদম্বার পায়ে নিবেদন করে নির্ভার হওয়া। একজন সন্ন্যাসী হয়ে নিজের স্ত্রীকে দেবীজ্ঞানে পুজো করা আধ্যাত্মিক ইতিহাসে বিরল। এর মাধ্যমে তিনি জগৎকে বার্তা দিলেন প্রত্যেক নারীরই আদ্যাশক্তির অংশ। উল্লেখ করা যায়, মাতৃময়ী শ্রীরামকৃষ্ণের ছোটোবেলায় গর্ভধারিণী থেকে দাইমা, ধর্মদাস লাহার পত্নী ও মেয়ে, চিনু শাঁখারির মেয়ে বিলাসিনী, কামারনি খেতির মা, পাইন বাড়ির মহিলাকুল, ভানুপিসি এবং পরবর্তীকালে রানি রাসমণি, গোপালের মা অঘোরমণি, যোগীন্দ্রমোহিনী, গোলাপসুন্দরী দেবী প্রমুখ নারী শ্রীরামকৃষ্ণের বাৎসল্যলীলার অনুপম চরিত্র হয়ে আছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ নারীমাত্রই দেখতেন তাঁরা জগদম্বার এক একটি অবয়ব। তাঁর এই ভাব সম্বন্ধে প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ দ্বিধাহীনভাবে বলতে পেরেছেন— ‘হি ওয়াজ দ্য সেভিয়ার অব উইমেন...।’ তিনি জগৎজোড়া মহিলাজগতের পরিত্রাতা।
নারীর মধ্যে জগন্মাতার প্রাণসঞ্চার যুগের পক্ষে কতখানি মাহাত্ম্যপূর্ণ এবং ভাবীকালের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় তা উপলদ্ধি করেছিলেন স্বামীজি। শিষ্য হরিপদ মিত্রকে ২৮ ডিসেম্বর ১৮৯৩ সালে একটি চিঠিতে স্বামীজি লিখছেন, ‘আমরা স্ত্রীলোককে নীচ, অধম, মহা হেয়, অপবিত্র বলি। তার ফল—আমরা পশু, দাস, উদ্যমহীন, দরিদ্র।...মেয়েদের উন্নতি করতে পারো? তবে আশা আছে। নতুবা পশুজন্ম ঘুচিবে না।’ অন্যত্র লিখেছেন, ‘মেয়েদের পূজা করেই সব জাত বড় হয়েছে। যে-দেশে, যে-জাতে মেয়েদের পূজা নেই, সে-দেশ — সে-জাত কখনও বড় হতে পারেনি, কস্মিনকালে পারবেও না।’
আর একটি চিঠি স্বামী শিবানন্দজিকে ১৮৯৪ সালে স্বামীজি লিখলেন, ‘মা ঠাকরুন কি বস্তু বুঝতে পারনি, এখনও কেহই পার না, ক্রমে পারবে। ভায়া, শক্তি বিনা জগতের উদ্ধার হবে না। আমাদের দেশ সকলের অধম কেন, শক্তিহীন কেন?— শক্তির অবমাননা সেখানে বলে। মা-ঠাকুরানী ভারতে পুনরায় সেই মহাশক্তি জাগাতে এসেছেন, তাঁকে অবলম্বন করে আবার সব গার্গী, মৈত্রেয়ী জগতে জন্মাবে।’
সন ১২৮০ সালের জ্যৈষ্ঠ অমাবস্যার রাতের সারদাদেবীকে জগন্মাতা বা ‘ষোড়শী’ রূপে যুগান্তকারী ওই পুজোর কারণেই ফলহারিণী কালীপুজো শ্রীরামকৃষ্ণ অনুসারী ও ভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলহারিণী কালীপুজোর প্রচলন বাংলায় মূলত অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে ব্যাপকভাবে শুরু হয়। নির্দিষ্টভাবে জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যায় নানান ফল দিয়ে আরাধনা করা হয়।
নামের মধ্যেই নিহিত আছে অর্থ—ফলহারিণী হলেন যিনি অশুভ কর্মফল নাশ করে, ভক্তকে ভুক্তিমুক্তি দান করেন। ভক্তের বিশ্বাস, এই দিন দেবীর আরাধনা করলে সমস্ত অশুভ ফল দূর হয় এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটে।
জ্যৈষ্ঠ মাসের মরশুমি ফল যেমন আম, জাম, লিচু ইত্যাদি দিয়ে দেবীকে বিশেষ ভোগ দেওয়া হয়।
শাস্ত্র মতে, এই তিথিতে নিষ্ঠাভরে দেবীকে মরশুমি ফল নিবেদন করলে ভক্তের মনের ইচ্ছা বা সংকল্প পূরণ হয়।
পরিবারে নারীশক্তি বা মাতৃশক্তির প্রতি সম্মান বৃদ্ধি পায় এবং সাধকের আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটে। ব্যক্তিগত জীবনে ও গৃহের চারপাশ থেকে নেতিবাচক বা অশুভ শক্তির প্রভাব দূর হয়।
অনেক সাধু সমাজের বিশ্বাস, এই বিশেষ দিনে জগন্মাতার আরাধনা করলে মোহ ও মায়া ত্যাগ করে মোক্ষ বা মুক্তি লাভের পথ প্রশস্ত হয়। মা শক্তি, জ্ঞান, ইচ্ছাশক্তি ও কর্মশক্তির প্রতীক। ফলহারিণী কালী পুজোর মাধ্যমে বিদ্যা, কর্ম ও অর্থভাগ্যের উন্নতি হয়। জীবনের অনেক ক্ষেত্রের বাধা দূর হয় এবং জীবন সুখময় হয়। বাংলার বিভিন্ন কালীমন্দিরে এই তিথিতে পালিত হয় বিশেষ পুজো।
তারাপীঠে মা তারাকে আম, জাম, কলা, লিচু এবং শসা সহ বিভিন্ন মরশুমি ফলের মালা দেবীকে নিবেদন করা হয়। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সব আশ্রমগুলিতে এই দিনটি বিশেষভাবে পালিত হয়। উত্তর ভারতে এই দিনটি বট অমাবস্যা বা বট সাবিত্রী ব্রত নামেও পরিচিত, বটবৃক্ষের পুজো করা হয়। এই পুজোয় ভক্তের সকল কর্মফল হরণ করে মা ভুক্তিমুক্তি প্রদান করেন।
(ছবি: সংশ্লিষ্ট সংস্থার সৌজন্যে)