দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: নদীয়ার শান্তিপুরের মতো ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলে ধর্মীয় উৎসব মানেই আড়ম্বর, ইতিহাস আর লোকবিশ্বাসের মেলবন্ধন। দুর্গা বা কালীর বন্দনা এখানে শুধুই আরাধনা নয়, সংস্কৃতিরও প্রতিচ্ছবি। এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যেরই এক অনন্য অধ্যায় ‘মহিষখাগী কালীপুজো’। যার নাম উচ্চারণের মধ্যেই যেন গা ছমছমে ব্যাপার।
বিশ্বাস করা হয়, প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে এক তান্ত্রিকের হাত ধরে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে তন্ত্র সাধনার সময় তিনি দেবীর দর্শন পান। দেবীর আদেশেই শুরু হয় কালী আরাধনা। ওই তান্ত্রিক মহিষের রক্ত দিয়ে পুজো করতেন। সেই থেকে নাম ‘মহিষখাগী কালী’। তবে পুজোর ইতিহাস নিয়ে আরও একটি প্রচলিত কাহিনি রয়েছে। বলা হয়, এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। কথিত, তিনি একসময় ১০৮টি মহিষ বলির প্রথা চালু করেছিলেন। রাত থেকে শুরু হওয়া সেই বলি শেষ হতে ভোর হয়ে যেত। এত মহিষবলির কারণেই পুজোর এই নামকরণ। এমনটাই মনে করেন স্থানীয়রা।
কর্তৃত্ব একাধিকবার হাতবদল হলেও পুজো থেমে যায়নি কখনও। প্রথমে তান্ত্রিকের কাছ থেকে আন্দুদেবী নামে এক মহিলার হাতে এই পুজোর অনুমতি আসে। পরে তাঁর কাছ থেকে গোপাল চট্টোপাধ্যায় নামে এক ব্রাহ্মণ পরিবার এই পূজোর দায়িত্ব নেন। তাঁদেরই উত্তরসূরিরা বিশেষত শিপ্রা মুখোপাধ্যায়ের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে পুজো পরিচালনা করে আসছিলেন।
বর্তমানে অবশ্য এই ঐতিহ্যবাহী পুজোর দায়িত্বে রয়েছেন এক বারোয়ারী সংগঠন। সংগঠনের সম্পাদক কৃষ্ণচন্দ্র সেন বলেন, ঠিক যেমনভাবে মেয়ের বিয়ে হয়, তেমনভাবেই আমাদের কালীপুজো হয়। ভোররাতে দধি-মঙ্গল দিয়ে পুজোর সূচনা হয়। অমাবস্যা পড়লে সমস্ত রীতিই বিবাহ-আচার মেনে পালন করা হয়। পুজো শেষে কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় বিসর্জনের জন্য। হাজার হাজার মানুষ শোভাযাত্রায় অংশ নেন। যদিও এখন বলি প্রথা বন্ধ। কিন্তু মানতের প্রথা আজও বজায় রয়েছে।
কৃষ্ণচন্দ্রবাবু জানিয়েছেন, আমরা আন্দুদেবীর নাম পর্যন্ত জানতে পেরেছি। তবে, যে তান্ত্রিকের হাত ধরে পুজোর সূত্রপাত হয়েছিল, তাঁর নাম আজও রহস্যে ঢাকা। তবে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের যোগসূত্র নিয়ে নানা প্রচলিত গল্প আজও শোনা যায়।
ইতিহাস, রহস্য আর ভক্তির মিশেলে আজও জৌলুসে হয় শান্তিপুরের মহিষখাগী কালীপুজো। প্রতি বছর অমাবস্যার রাতে দেবী আরাধনায় মেতে ওঠে গোটা শান্তিপুর, যেখানে অতীতের তন্ত্র, জমিদারি ঐতিহ্য আর জনবিশ্বাস মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য সাংস্কৃতিক অধ্যায়।