উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী হয়ে বড়ো চমক দিয়েছেন অভয়ার মা! ২০২৪-এর ৯ আগস্ট গভীর রাতে আর জি কর হাসপাতালে ধর্ষণ করে খুন করা হয় তরুণী চিকিৎসক অভয়াকে। এই ঘটনায় প্রথমে কলকাতা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও অচিরেই আদালতের নির্দেশে তদন্তভার তুলে দেওয়া হয় সিবিআই-এর হাতে। কারণ তাঁর বাবা-মা সেটাই চেয়েছিলেন। বিচারাধীন সেই মামলায় এখনও পর্যন্ত একজন দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। মামলা কতদিন চলবে, কবে শেষ হবে, আর কী প্রমাণ পাওয়া বাকি আছে— এমন অজস্র প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা। এর মধ্যেই ভোটের প্রার্থী হয়ে রাজনীতির ময়দানে অবতীর্ণ অভয়ার মা। তাঁর নিজের কথায়, রাজনীতিকে ‘ঘৃণা’ করত তাঁদের মেয়ে। তাঁরাও রাজনীতি থেকে শত যোজন দূরের মানুষ। তবু মৃত মেয়ের কাছে ‘ক্ষমা’ চেয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য, পানিহাটির উন্নয়ন আর মেয়ের খুনের ন্যায়বিচার আদায় করা। কোনো সন্দেহ নেই, একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সংসদীয় গণতন্ত্রে অংশ নিয়ে ভোটে প্রার্থী হওয়ার অধিকার রয়েছে এই সন্তানহারা জননীর। ভোটে জিতে তিনি লক্ষ্যপূরণ করতে পারবেন কি না সেটা অন্য প্রশ্ন।
তবু তাঁর এই প্রার্থী হওয়াটা অনেক ‘কিন্তু’র জন্ম দিয়েছে। অভয়ার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর থেকে শয়নে-স্বপনে-জাগরণে সবসময় কলকাতা পুলিশ এবং সিবিআইকে প্রায় একই দাঁড়িপাল্লায় তুলে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন মৃতার বাবা-মা। কলকাতা পুলিশ রাজ্য সরকারের অধীন। তাঁদের মেয়ের খুনের ঘটনার ‘ন্যায়বিচার’ পাননি বলে রাজ্য সরকারকে কাঠগড়ায় তোলার পাশাপাশি প্রমাণ লোপাটের গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন এই দম্পতি। আর কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন সিবিআই-এর বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযোগ ছিল, এরা প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দিচ্ছে, দোষীদের আড়াল করছে, ঠিকমতো তদন্ত করছে না। অর্থাৎ কলকাতা পুলিশ ও সিবিআই— দুটোই সমান। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করে মেয়ের ন্যায়বিচার চাইবেন বলে দিল্লিও গিয়েছিলেন অভয়ার মা-বাবা। শাহের দেখা পাননি। দেড় বছরেও না! একই দাবিতে সিবিআই দপ্তরে গিয়ে সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করার পর তাঁদের মনে হয়েছিল, এ সবই বেকার। এদের মেরুদণ্ড নেই! তাঁরা পৌঁছেছিলেন আদালতেও। এবার দেখা গেল, মেয়ের খুনের ঘটনার সঠিক তদন্ত, প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচারের একবুক আশা নিয়ে সেই কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির খাতায় নাম লিখিয়ে প্রার্থী হলেন অভয়ার মা! প্রশ্ন হল, তবে কি কোনো ঘটনায় ন্যায়বিচার পেতে হলে বিজেপি করতে হবে? সরাসরি এমন স্বীকারোক্তি না মিললেও একটা ব্যাখ্যা হল, একটা ক্ষমতার (রাজ্য সরকার) বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে আরেকটা ক্ষমতাকে (কেন্দ্রীয় সরকার) আঁকড়ে ধরতে হবে। রাজনীতির এই চেনা আপ্তবাক্যকে শিরোধার্য করেই কি বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন অভয়ার মা? তিনি নিজেও বলেছেন, জিতলে ন্যায়বিচার নিশ্চয়ই পাব। তবে কি গেরুয়া পতাকা হাতে না নিলে বিচার না মেলার অভিযোগে কোথাও সিলমোহর পড়ে গেল! এতদিন শোনা যেত, বিজেপির ‘ওয়াশিং মেশিনে’ পড়লে দুর্নীতিগ্রস্তরাও নাকি ‘শুদ্ধ’ হয়ে যান! এবার তবে কি এল নতুন থিওরি? ‘বিচার’ পেতে হলে বিজেপিতে নাম লেখাতে হবে, না হলে বিচার মিলবে না!
অভয়ার ঘটনায় কার্যত তোলপাড় হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত। ২০২৪-এর ১৪ আগস্ট ‘রাত দখলের’ ডাকে যে ছবি তৈরি হয়েছিল, তার কোনো নজির নেই অন্তত এ রাজ্যে। ‘জাস্টিস ফর আর জি কর’-এর দাবিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দিনের পর দিন পথে নেমেছিলেন অসংখ্য মানুষ। এখানে হাসপাতালগুলিতে জুনিয়র ডাক্তাররা কর্মবিরতি পালন করেছেন। যার জেরে চরম দুর্ভোগে পড়েন চিকিৎসা করতে আসা বহু মানুষ। সেই আন্দোলনের জেরে অপারেশন বন্ধ, রোগী মৃত্যুর ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে এ রাজ্যে। প্রথমে যে আন্দোলন ছিল ‘অরাজনৈতিক’, পরবর্তীকালে তার চরিত্র বদলাতে থাকে। ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির’ অভিযোগ তুলে রাজ্য সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সক্রিয় হয়ে ওঠে রাজনীতির কারবারিরা। ঘটনার সঠিক তদন্ত সিবিআই করেছে কি করেনি সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। রাজ্যের তদন্তে আস্থা না রেখে সিবিআই তদন্ত তো অভয়ার বাবা-মা চেয়েছিলেন। রাজ্য সরকার তাতে কোনো আপত্তিও করেনি। দেখা গেল, রাজ্য সরকার তদন্ত করে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল তাতেই সিলমোহর দিয়েছে সিবিআই। অর্থাৎ একজনকেই দোষী সাব্যস্ত করেছে। সাজা ঘোষণাও হয়েছে। তাই প্রশ্ন উঠছে, যে সিবিআই তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে অভয়ার পরিবার প্রশ্ন তুলেছে, সেই সিবিআই তো কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থা। আর এই সিবিআই-এর ব-কলমে নিয়োগকারীদেরই প্রার্থী হয়েছেন অভয়ার মা! আরও প্রশ্ন উঠছে, কোনো দলীয় পতাকার বাইরে গিয়ে যে প্রতিবাদ আন্দোলন চলমান থেকেছে বলে এতদিন দাবি করা হচ্ছিল, তাতে কি এবার সরাসরি রাজনৈতিক রং লেগে গেল না? অভয়ার মা আগে শত চেষ্টা করেও মোদি-শাহের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি, বিজেপি প্রার্থী হয়ে এবার তাঁদের আশা, দেখা হবে। আসলে কী হবে তার উত্তর সময়েই মিলবে।