হিমাংশু সিংহ: রবীন্দ্রভারতীর ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। গোল্ড মেডেলিস্ট কৃষ্ণমৃত্তিকা নাথ। রাজ্যপালের হাত থেকে তাঁর মেধার স্বীকৃতি পেয়েছেন আগেই। উত্তর ২৪ পরগনার সাধারণ ঘরের এহেন স্বর্ণপদক পাওয়া মেয়েকে নিঃসন্দেহে অযোগ্য বলতে পারবেন না কেউ। ছ’বছর ধরে দক্ষতার সঙ্গে পড়াচ্ছেন রায়গঞ্জের কৈলাসচন্দ্র রাধারানি স্কুলে। বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো তিনিও চাকরি হারিয়েছেন মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের গত বৃহস্পতিবারের রায়ে। গোটা বাংলা দেখেছে, দুঃখে হতাশায় কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরছেন তিনি। তাঁর অপরাধ? মাননীয় ন্যায়াধীশ, ন্যায়চূড়ামণিদের সবিনয়ে প্রশ্ন করি, তিনিও অযোগ্য কোন বিচারে? তিনি তো অসদুপায়ে শিক্ষক হননি। ‘টেন্টেড’ তালিকাতেও ছিলেন না। তাঁকে বেতনের অর্থ ফেরত দিতেও বলা হয়নি। তাহলে এই প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতির দায় তাঁর ঘাড়ে চাপবে কেন?
শিলিগুড়ির অনামিকা রায়ের দুর্দশাটা ভাবুন? প্রথমে ওই পদে চাকরি পান প্রাক্তন মন্ত্রী পরেশ অধিকারীর কন্যা অঙ্কিতা। সাড়ে তিন বছর চাকরি করার পর হাইকোর্টের নির্দেশে অঙ্কিতার চাকরি কেড়ে দেওয়া হয় ববিতা সরকারকে। ভাবলাম নিশ্চয় সুবিচার হচ্ছে। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই ববিতার নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দরজায় যান বিবেকানন্দ পল্লির অনামিকা রায়। যথারীতি মামলা চলে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মাত্র গত সেপ্টেম্বরেই অনামিকা হাইকোর্টের রায়ে চাকরিটা পান। ভাগ্যের এমনই পরিহাস ছ’মাস যেতে না যেতেই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এবার অনামিকাও চাকরিহারা! হাইকোর্টের দেওয়া চাকরি গেল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে। তাহলে কে ঠিক, আর কে বেঠিক? অসহায় শিক্ষক শিক্ষিকারা কোথায় যাবেন বিচার চাইতে? আদালতের ঐতিহাসিক রায়ে মুড়ি-মিছরির মতো যোগ্য ও অযোগ্যের বিভেদ রেখাও মুছে যেতে পারে কখনও। এর নামই কি আইনের শাসন?
এটা নিশ্চিত, শিক্ষক নিয়োগে বড় দুর্নীতি হয়েছে। কিন্তু একটা গ্রামে যদি দশ জন ডাকাত, লুটেরা, দাঙ্গাবাজ বাস করে, তাহলে প্রশাসন, পুলিস ও বিচার ব্যবস্থার কী কাজ হওয়া উচিত। ওই দশজনকে বেছে আলাদা করে কঠোর শাস্তি দেওয়া। জেলে পোরা। নাকি গ্রামের সৎ-অসৎ, ডাকাত-সাধু সবাইকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়ে খতম করে দেওয়া! চিরাচরিত ব্যবস্থাকে সম্মান জানিয়েই বলি, এর নাম বিচার? ঠগ আলাদা করতে ব্যর্থ হয়ে গ্রামের দশ হাজার নিরীহ আইন মানা নাগরিককেও শাস্তি দেওয়া ‘সুবিচার’ হতে পারে না। ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ বিচার ব্যবস্থা কিংবা ‘মানবিক’ সরকারের থেকেও এটা কাঙ্ক্ষিত নয়। বিশেষ করে যখন তদন্তের দায়িত্বে দেশের সর্ববৃহৎ অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান সিবিআই। তাহলে কোন যুক্তিতে পুরো প্যানেলটাকেই বাতিল করে দিতে হল? এটা কি অভিপ্রেত? টানা কয়েক বছর চেষ্টা চালিয়েও পচা আম বেছে আলাদা করতে না-পারার দায় কার? নিশ্চিতভাবে সিবিআইয়ের। এসএসসি বলছে, অনেক পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে। সিবিআই ৬২৭৬ জনকে চিহ্নিত করেছে তাও তো এসএসসি’র দেওয়া তথ্যকে ঢাল করেই। তবু এতদিন পর মন্ত্রী-সান্ত্রি সহ গোটা শিক্ষা দপ্তরটাকে জেলে পুরেও যোগ্য অযোগ্য বাছাই করা গেল না কোন যুক্তিতে? আইনে যেমন অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার কথা বলা আছে, তেমনই একজনও নির্দোষ যেন সাজা না-পান, সে-কথাও বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নীরবে নিভৃতে কাঁদা বিচারের বাণী কি ভাষা পেল, নাকি মৌন নির্বাক হয়ে অন্ধকারে ডুব দিল! বলা ভালো, বিচারের আড়ালে বঞ্চনার আর একটা নতুন নজির সৃষ্টি হল। এ তো ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়। মহমান্য সর্বোচ্চ আদালতকে সম্মান জানিয়েই বলছি, গোটা প্যানেলটাকে উজাড় না করে কি ‘ঠগ’ আলাদা করা যেত না?
সিবিআই বারবার বলেছে, ৬২৭৬ জন অযোগ্য। সেই অযোগ্যদের বেতন ফেরতের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে খবর। যদিও তা নিয়েও দু’শো বিভ্রান্তি স্পষ্ট। এনিয়েও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে বাধ্য। কারণ তাহলে কারা দুর্নীতি করে চাকরি পেয়েছেন, আর কারা সৎভাবে শিক্ষকতা করছেন, সেই কাটাকুটি খেলার নিষ্পত্তি তো হয়েই গিয়েছে। তাহলে বাকি ২০ হাজার যোগ্য শিক্ষক অপরাধ না করেও চরম শাস্তি পাবেন কেন? তাঁদের সামাজিক সম্মান আছে, সংসার আছে, সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মা আছেন। দশ বছর প্রত্যেকের কাছেই খুব কম সময় নয়। এর মধ্যে জীবনের অনেক বাঁক ঘোরা হয়ে যায়। এখন হঠাৎ পরীক্ষায় বসতে বলাটাই বা কতটা সমীচীন। দশ বছর আগে যিনি বিচারপতি হয়েছেন তাঁকে এখন আবার আইনের পরীক্ষায় বসতে বললে সচ্ছল সাবলীলভাবে সব প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারবেন তো! ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার পেশাদারি জগতের যেকোনও ব্যক্তির ক্ষেত্রেই এটা দস্তুর। দু’দশক আগের অঙ্কের কোনও গোল্ড মেডেলিস্টকে আজ এমএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন দিয়ে দেখুন তো কত পায়? তার উপর কাদের পরীক্ষা নিয়ে নতুন করে নিয়োগ করা হবে তাও এখনও স্কুল সার্ভিস কমিশনের কাছেই স্পষ্ট নয়। ২৬ হাজারই পরীক্ষায় বসতে পারবে তো! যদি আগের বারের তেইশ লাখ ছেলেমেয়েকেই পরীক্ষায় ডাকতে হয়, সেক্ষেত্রে তো নতুন করে বিরাট দায়িত্ব চাপবে। এমতাবস্থায় তিন মাসের মধ্যে নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে কি না তা নিয়ে পাহাড়প্রমাণ জটিলতা সৃষ্টি হতে বাধ্য। যেমন বিভ্রান্তি দেখা দিতে বাধ্য কারা বেতন ফেরত দেবেন তা নিয়েও। একদল বলছেন দিতে হবে, মুখ্যমন্ত্রী বলছেন দিতে হবে না। আসলে নির্দেশে বলা যত সহজ, মাটিতে দাঁড়িয়ে তা কার্যকর করা ততটাই কঠিন। যোগ্য অযোগ্যই যদি বাছাই করাই গেল না তাহলে এতদিন ধরে সিবিআই এত হানা, এত তল্লাশি, শিক্ষামন্ত্রীসমেত শিক্ষাদপ্তরটাকেই জেলে আটকে রেখে কোন রাজকার্যটা সম্পন্ন করল? সবটাই লোকদেখানো নাটক নয় তো? আমরা শুধু সাইডলাইনের বাইরে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছি। কিন্তু ঠগ বাছা না গেলে গাঁ-টিকেই পরিত্যক্ত বলে কেউ ঘোষণা করতে পারে না। আসল আর নকল আলাদা করতে না পেরে মহামান্য আদালত সবাইকে একতরফা বাতিল ঘোষণা করে দিলেন! মহামান্য প্রধান বিচারপতির সেই রায় শিরোধার্য হলেও কিছুতেই প্রশ্নাতীত হতে পারে না। কারণ এতদিন জানতাম, আইনের বিচার এমন হওয়া উচিত, যাতে হাজার অপরাধী ছাড় পেয়ে গেলেও একজন নিরপরাধও যেন সাজা না পায়। আইনের এই পবিত্র দৃষ্টিভঙ্গি যে কালে কালে বদলে গিয়েছে তা জানা ছিল না।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই বাতিল ছাব্বিশ হাজারের মধ্যে ১৯-২০ হাজার যোগ্য শিক্ষক। এবং তাঁদের ছাড়া রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে বাধ্য। স্বভাবতই তাঁদের চোখের জলের মূল্যও যে কোনও স্বাধীন দেশের বিচার ব্যবস্থার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। এখন কী হবে? মহামান্য আদালত, শ্রদ্ধেয় প্রধান বিচারপতি এই বিষয়টা একবারও ভাবলেন না? নাকি মহামান্য আদালতের হাতে এছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না? দুর্নীতির রাস্তা ধরে যারা চাকরিতে ঢুকল, তাদের চাকরি বহাল রাখা কোনওমতেই বরদাস্ত নয়। দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করে সর্বোচ্চ আদালত সঠিক কাজই করেছে। কারণ তা না করলে এই নজিরকে সামনে রেখে আগামী দিনে তাঁরাই আরও বড় দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করায় মন দেবেন। বুক ফুলিয়ে ঘুরবেন, সভায় সভায় বক্তৃতা করবেন, জনদরদি সাজবেন। আর ভবঘুরে হয়ে হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত হবেন যোগ্যরা। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রশ্ন থেকে যায়, যদি গোটা প্যানেলটাই বাতিল হবে তাহলে গতবছর মে মাসে কলকাতা হাইকোর্টের রায়ের উপর কেন স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি অবসরপ্রাপ্ত ডিওয়াই চন্দ্রচূড়? তিনি টাকা ফেরতের নির্দেশকেও আমল দেননি। এক বছরের মধ্যে চিত্রটা ১৮০ ডিগ্রি বদলে গেল কোন যুক্তিতে?
বহু স্কুলে সামনেই পরীক্ষা। বিশেষ করে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে একদিনও ফাঁক দিলে সিলেবাস শেষ করাই কঠিন। কিন্তু যে হারে শিক্ষক শিক্ষিকারা কাজ হারিয়েছেন তাতে আগামী সোমবার থেকে রাজ্যের স্কুলগুলিতে পঠনপাঠন লাটে ওঠা প্রায় অনিবার্য। কোনও স্কুলে দশ জন, কোথাও আবার ৩৬ জন পর্যন্ত শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন। তাহলে ক্লাস নেবেন কারা? বিশেষ করে বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখায়। অন্যথায় যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন তাঁদেরই ডেকে ক্লাস নিতে বলতে হবে। রাজ্য শিক্ষাদপ্তর কী করবে, সর্বোচ্চ আদালতই-বা এর কী ব্যাখ্যা দেবে, নাকি ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের আগে বাংলার স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থাটাকেই পঙ্গু করে দেওয়ার এ এক পূর্বপরিকল্পিত ব্লুপ্রিন্ট? সোজা ভাষায় তার উত্তর নেই। নিশ্চিতভাবে সময়টা রাজনীতির নয়। হাজার হাজার ছেলেমেয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছে।
চোখে জল। সামনে অন্ধকার। এমন অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে ‘শকুন’রা মানবিক হওয়ার বদলে সুযোগ খুঁজবেই। বিরোধী দল, শাসক গোষ্ঠী একে অপরের উপর দায়দায়িত্ব ঠেলবে। কিন্তু আখেরে ক্ষতি হবে বাংলার ছেলেমেয়েদের। ভাত
দেওয়ার মুরোদ নেই কিল মারার গোঁসাইরা চারপাশে পাক খাবে। কিন্তু তাদের মনে করিয়ে দিতে হবে, রাজনীতি নয়, ক্ষমতা দখলের সস্তা ধান্দাবাজিও নয়, দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের উচিত চাকরিহারাদের পাশে দাঁড়ানো। কারণ এই রায়ের সামাজিক অভিঘাত আমার আপনার সবার ঘরেই ধাক্কা দিতে বাধ্য।
‘দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার!’ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এসএসসি এবং শিক্ষাদপ্তরকে যোগ্য চাকরিহারাদের যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষকতায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। ভোট রাজনীতি আপাতত দূরে থাক। তাঁদের কাজে ফেরানোই রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সব মহলের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। মুখ্যমন্ত্রী মানবিক হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। সোমবার তাঁর ঘোষণার দিকে তাকিয়ে চাকরিহারারা। তাই সবিনয়ে বলছি, কিল মারার স্বঘোষিত গোঁসাইরা ভাত দিতে না পারুন, আপাতত চুপ থাকুন।