সুকান্ত বসু, কলকাতা: খোরপোশ সংক্রান্ত মামলায় এক ব্যক্তির বাড়ি গিয়ে ‘সমন’ না দিয়েও, পুলিশ মিথ্যা রিপোর্ট পেশ করায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল আদালত। বিচারক বনগাঁ থানার তৎকালীন ওসি এবং সংশ্লিষ্ট থানার আরও এক পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। সম্প্রতি উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক প্রদীপকুমার অধিকারী ওই কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। দুই পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেই মর্মে আগামী ১৯ নভেম্বর আদালতে রিপোর্ট পেশ করার জন্য পুলিশ সুপারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। বিচারক বনগাঁ থানার ভূমিকায় অসন্তোষ জানানোর পাশাপাশি শুনানির দিন ভরা আদালতে চরম উষ্মাও প্রকাশ করেন। বিচারক এজলাসে বলেন, যে ঘটনা ঘটেছে, তা ফৌজদারি অপরাধের শামিল। মিথ্যা রিপোর্ট পেশ করে পুলিশ আদালতকে চরম বিভ্রান্ত করেছে। তাতে আদালতের সময় যেমন নষ্ট হয়েছে, তার সঙ্গে মামলায় কোর্টের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু বিভ্রান্তিরও সৃষ্টি হয়। যা কখনই কাম্য ছিল না।
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, বনগাঁর মহকুমা আদালতে (বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট) ২০২২ সালের চলা এক খোরপোশের মামলায় অভিযোগকারিণীর স্বামীকে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়েছিল। সেই মর্মে আদালত ওই আইনি নথি পাঠায় বনগাঁ থানায়। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, কোর্টের ওই সমন পুলিশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাড়িতে দিয়ে আসেনি। এমনকী বনগাঁ থানার পুলিশ আদালতে মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে জানায়, কোর্টের সমন পুলিশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে না পেয়ে তাঁর ভাইয়ের হাতে দিয়ে এসেছে। এদিকে, মূল মামলার শুনানিতে অভিযোগকারিণীর স্বামী আদালতে গরহাজির থাকার ফলে ওই খেমামলায় একতরফাভাবে আদেশ হয়।
আদালত থেকে বিষয়টি জানতে পেরে আকাশ থেকে পড়েন মামলাকারিণীর স্বামী। তিনি খোঁজখবর শুরু করেন। আইনজীবী মারফত তিনি জানতে পারেন, পুলিশ তাঁকে আদালতের কোনও সমনই পাঠায়নি। আর ভাই বলে যাকে সমন দেওয়া হয় বলে পুলিশ দাবি করেছে, ওই নামে তাঁর কোনও ভাই নেই। এরপরই তিনি পুরো বিষয়টি নিয়ে বনগাঁর উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। সেই খোরপোশের আপিল মামলার শুনানি চলাকালে বিচারক প্রদীপকুমার অধিকারীর নজরে আসে ওই সমনের বিষয়টি। তিনি বনগাঁর এসডিপিওকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে ওই পুলিশ আধিকারিক পরবর্তী সময় আদালতে রিপোর্ট দিয়ে জানায়, আদালতের ওই ‘সমন’ নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দেওয়াই হয়নি। বনগাঁ থানা আদালতে যে রিপোর্ট পেশ করেছে, তা সঠিক নয়। জেলা পুলিশের ওই পদস্থ আধিকারিকের ওই রিপোর্ট পাওয়ার পরই বিচারক এই কড়া নির্দেশ দেন। জেলার প্রবীণ আইনজীবীদের একাংশের বক্তব্য, এইভাবে কোনও বিচারপ্রার্থীকে হয়রানি কোনওমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। এতে তাঁর আইনি অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। পুলিশ যে কাজ করেছে, তা গর্হিত অপরাধ। সে ক্ষেত্রে আদালত যে কড়া আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা অত্যন্ত ন্যায় সঙ্গত।