Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নির্মম রসিকতা

আগে বেতন ছিল মাসে এক লক্ষ টাকা। ২৪ শতাংশ বেড়ে তা হয়েছে ১ লক্ষ ২৪ হাজার টাকা। আগে দৈনিক ভাতা ছিল ২ হাজার টাকা।

নির্মম রসিকতা
  • ২২ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আগে বেতন ছিল মাসে এক লক্ষ টাকা। ২৪ শতাংশ বেড়ে তা হয়েছে ১ লক্ষ ২৪ হাজার টাকা। আগে দৈনিক ভাতা ছিল ২ হাজার টাকা। ৫০০ টাকা বেড়ে এখন হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। আগে পেনশন ছিল মাসে ২৫ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩১ হাজার টাকা। দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধির সূচকের সঙ্গে তাল মেলাতে গত ২৪ মার্চ সাংসদদের বেতন-ভাতা-পেনশন বৃদ্ধির এই সুখবর শুনিয়েছে মোদি সরকার। আরও বলা হয়েছে, এই নতুন হার কার্যকর হবে ২০২৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে। অর্থাৎ সাংসদরা ২৪ মাসের বর্ধিত টাকা বকেয়া পাবেন। শুধু এই বর্ধিত বকেয়া হিসেবে একজন সাংসদ ৫.৭৬ লক্ষ টাকা এরিয়ার পাবেন। যাঁদের জন্য মোদি সরকারের এই মহার্ঘ তোফা তাঁদের সম্পত্তির দিকে একবার চোখ বোলানো যাক, অ্যাসোসিয়েট ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস-এর বিশ্লেষণ করা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে জিতে আসা ৫৪৩ জন সাংসদের মধ্যে ৫০৪ জনই কোটিপতি। ’২৪-এর ভোটে লড়াই করা প্রতি তিন জন প্রার্থীর মধ্যে একজন ছিলেন কোটিপতি। মোদি জমানায় এই কোটিপতি বা শতকোটিপতির সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। কীরকম? ২০০৯ এর লোকসভা ভোটে বিজয়ী সাংসদদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ ছিলেন কোটিপতি। ২০১৪-তে কোটিপতির সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৮২ শতাংশ। এর পাঁচ বছর পর ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে তা আরও বেড়ে হয় ৮৮ শতাংশ। আর ২০২৪-এর ভোটে ৯৩ শতাংশ সাংসদই কোটিপতি। আর বিজেপির জেতা ২৪০ জন সাংসদের মধ্যে কোটিপতি ৯৫ শতাংশ। এর মধ্যে ৩৪ জন ৫০ কোটি বা তার বেশি টাকার মালিক। ৬০ জন ১০ থেকে ৫০ কোটি টাকার মালিক। 

Advertisement

আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির মোকাবিলায় কোটিপতি সাংসদদের বেতন সোয়া লক্ষ টাকা করে দিতে দু’বার ভাবতে হয়নি প্রধানমন্ত্রীকে। কিন্তু এই একই কারণে মিড ডে মিলের জন্য বাস্তবসম্মত বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি হেলায় অবজ্ঞা করতে দু’বার ভাবেননি প্রধানমন্ত্রী! সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠরত পড়ুয়াদের বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া এবং দুর্বল শ্রেণির শিশু কিশোরদের স্কুলে যেতে উৎসাহিত করতে ১৯৯৫ সালে মিড ডে মিল প্রকল্প (বর্তমান নাম, পিএম পোষণ প্রকল্প) চালু হয়েছিল। গত তিন দশকে দেশের ১.২৭ মিলিয়ন স্কুলের প্রায় ১২ কোটি পড়ুয়া বর্তমানে এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। তাদের জন্য কেন্দ্র-রাজ্যের টাকায় দুপুরে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হয়। বাচ্চাদের স্বাস্থ্যকর খাবারের তালিকায় কী কী, কত পরিমাণ করে খাদ্য থাকবে তাও বলে দেওয়া আছে কেন্দ্রীয় নির্দেশিকায়। যেমন, ২০ গ্রাম প্রোটিন, ৩০ গ্রাম ডাল, ৭৫ গ্রাম আনাজ এবং যথাযথ তেল-নুন-মশলা। বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, প্রতিদিন একজন পড়ুয়াকে এমন খাবার দিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা প্রয়োজন। কারণ এরসঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী গ্যাস, ভোজ্য তেল, আনাজপাতির দাম যুক্ত। কিন্তু যেটা সাদা চোখে দেখা যায়, সহজ অঙ্কে বোঝা যায়, তা চোখে পড়ে না মোদি সরকারের! তারা চোখ বন্ধ করে রাখে। ফলে মাঝেমধ্যে নয়া পয়সার হিসেবে বরাদ্দের অঙ্ক সামান্য বাড়িয়ে শিশুদের খাদ্য নিয়ে চূড়ান্ত প্রহসন চলছে। এই বরাদ্দ বৃদ্ধি তাই নিষ্ঠুর পরিহাসের মতো শোনায়। 
প্রতিদিন প্রোটিনযুক্ত দেড়শো গ্রামের বেশি রান্না করা খাবারের জন্য কত বরাদ্দ? ২০২৪-এর নভেম্বরে প্রাথমিকে পড়ুয়াপিছু বরাদ্দ ছিল প্রতিদিন ৬ টাকা ১৯ পয়সা। উচ্চ প্রাথমিকে ৯.২৯ টাকা। পাঁচ মাস পর এ মাসেই বরাদ্দ বাড়িয়েছে মোদি সরকার। প্রাথমিকে ৫৯ পয়সা (৬.৭৮ টাকা বেড়ে হয়েছে) এবং উচ্চ প্রাথমিকে বেড়েছে ৮৮ পয়সা (হয়েছে ১০.১৭ টাকা)। অবাক লাগে, এই টাকায় পাঁচ থেকে ১৪ বছর বয়সি একজন পড়ুয়ার প্রতিদিনের দুপুরের আহারে প্রোটিনযুক্ত খাবারের বন্দোবস্ত করার নির্দেশ দিয়েছে মোদি সরকার। যেখানে খোলা বাজারে একটা পোলট্রির ডিমের দামই ৬ টাকা, সেখানে এই টাকায় পুষ্টিকর খাবারের কথা বলে একটি সরকার আসলে ছোটছোট বাচ্চাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে কি না সেই সঙ্গত প্রশ্ন উঠেছে। আসলে মোদি সরকার এই প্রকল্পটিকে কী চোখে দেখে তার একটা প্রমাণ হল, চলতি অর্থবর্ষের বাজেট। এই প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে ০.২৬ শতাংশ, মানে ১ শতাংশও নয়। সব মিলিয়ে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে শুধু প্রকল্পটিকে জিইয়ে রাখার ফল মিলছে হাতেনাতে। তথ্য বলছে, দেশের ৬২ শতাংশ স্কুল পড়ুয়ার ৪৮ শতাংশই অপুষ্টির শিকার। অপুষ্টি বা ক্ষুধাসূচকে বিশ্বের ১২৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৫। মিড ডে মিল নিয়ে তঞ্চকতার সাম্প্রতিক নজির হল কেন্দ্রের একটি নির্দেশিকা। অপুষ্টি বা ন্যূনতম পুষ্টির প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের স্কুলের খাবারের ভোজ্যতেলের ব্যবহার কমিয়ে ওজন কমানোর মতো অমানবিক নির্দেশও দিয়েছে মোদি সরকার। এর চেয়ে চরম রসিকতা বোধহয় আর হয় না। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ