Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কর্মসংকোচন: এক ভয়াবহ ইঙ্গিত

কর্মসংকোচন: এক ভয়াবহ ইঙ্গিত
  • ২৫ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বেসরকারি হলে পরিষেবা ভালো হবে! এমনই যুক্তি মোদি সরকারের। তাই গত একদশকে রীতিমতো লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণাসহ শুরু হয়েছে ‘সম্পদ মুদ্রাকরণ’। ব্যাঙ্ক, বিমা, বন্দর, বিমানবন্দর থেকে বিমান সংস্থা পর্যন্ত বহু জনমুখী ক্ষেত্র থেকেই সরকারের পিছুহটার পালা গতি পেয়েছে। কখনও সরাসরি গোটা কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা কিংবা তার মোটা অংশের শেয়ার বেচে দেওয়া হচ্ছে। আর তার ফল মিলেছে হাতেনাতে! কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্থাগুলিতে চলেছে ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাই। ফলে গত পাঁচবছরে এক ধাক্কায় গোটা সেক্টরে ‘বেকার’ হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক স্থায়ী কর্মী। পরিসংখ্যানের উল্লেখসহ সংসদের বাদল অধিবেশনে মোদি সরকারই জানিয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা মোট ছিল ৯ লক্ষ ২০ হাজার। বেসরকারিকরণের হুজুগে তা ২০২৪ সালের মার্চের শেষে ৮ লক্ষ ১২ হাজারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় চাকরি হারিয়েছেন ১ লক্ষ ৮ হাজার ব্যক্তি। বেসরকারিকরণের ধাক্কায় গত পাঁচবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির কত কর্মীর চাকরি খোয়া গিয়েছে? সম্প্রতি লোকসভায় সিপিএম এমপি আর সচিথানান্থমের প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী বি এল বর্মা জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে অসংরক্ষিত, সংরক্ষিত (ওবিসি বাদে) উভয় ক্যাটিগরিতেই স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা কমেছে। 

Advertisement

এসসি/এসটি কর্মীসংখ্যার শতকরা হার বৃদ্ধির ছবিটি আশাপ্রদ মনে হলেও বাস্তবে তা বিভ্রান্তিকর। আসলে মোট কর্মীসংখ্যা হ্রাসের অনুপাতেই তফসিলি কর্মীদের হারটা চওড়া দেখাচ্ছে! সংরক্ষিত শ্রেণির নিয়োগ বাস্তবে বৃদ্ধি পায়নি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রদত্ত তথ্যেই স্পষ্ট যে, বেসরকারিকরণের জন্য কর্মী সংকোচনের গতি ঊর্ধ্বমুখী। সারসত্য এটাই। স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে আগামী দু’বছরে সাড়ে তিন কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি মিলেছে। তাঁর পক্ষে এই কথা রাখা কি আদৌ সম্ভব? ভুক্তভোগী নাগরিকরা এই সংগত প্রশ্ন তুলেছেন। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দিয়েছেন মোদি নিজেই। ২০১৩ সালের শেষদিকে যে ভাষণ মোদিকে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা দিয়েছিল, যে স্বপ্ন ফেরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে তাঁকে সবিশেষ সাহায্য করেছিল তা নিঃসন্দেহে, ‘আমরা সরকার তৈরি করলে বছরে ২ কোটি নতুন চাকরি দেব!’ আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই প্রতিশ্রুতির কোনও সামঞ্জস্য নেই। আর বিরোধীরা রাখঢাক না করে বলেন যে, এটাই মোদির প্রথম এবং সর্ববৃহৎ ‘জুমলা’। এত বড় কথার খেলাপ বেমালুম চেপে গিয়ে, ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের কিছু আগেও প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী চাকরি বা কর্মসংস্থান নিয়ে আরও একাধিক স্বপ্ন ফেরি করেছিলেন। সেসবও এখনও দিনের আলো দেখেনি। যাই হোক, মোদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে বেসরকারিকরণের পালেই জোর হাওয়া! বিলগ্নিকরণ এবং সরকারি শেয়ার বেচে দেওয়ার জন্য ২০১৫ সালে ৩৫টি সংস্থা চিহ্নিত হয়। পরবর্তী একদশকে ১০টি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেসরকারি হাতে গিয়েছে। সেই তালিকায় উল্লেখযোগ্য নাম এয়ার ইন্ডিয়া। তেল কোম্পানি থেকে এলআইসি-সহ বহু লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বেচে দেওয়া হয়েছে। তাতে কেন্দ্রীয় কোষাগারে ঢুকেছে ৪ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে এসেছে ৬৯ হাজার কোটি টাকা বিলগ্নিকরণ থেকে এবং শেয়ার বেচে ৩ লক্ষ ১৫ হাজার কোটি টাকা। কিছু বড় সংস্থার বেসরকারিকরণের যে তালিকা ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রস্তুত হয়েছে তার মধ্যে আছে ভারত পেট্রলিয়াম, শিপিং কর্পোরেশন, কন্টেইনার কর্পোরেশন, আইডিবিআ‌ই, বিইএমএল, লাইফকেয়ার প্রভৃতি। বিলগ্নিকরণের চক্করে ম্রিয়মাণ একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কও। 
শেষ বাজেটেও সরকারি সংস্থা বেচে ৫১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছে। এসব বিকিকিনি থেকে রাজকোষের লাভক্ষতির প্রসঙ্গটি এখানে আলোচ্য নয়। এর অন্য দিকটি কিন্তু নির্মম—সরকারি ক্ষেত্রে চাকরি বা কাজের সুযোগ বৃদ্ধির বদলে তা নিম্নমুখী। সোজা কথায়, কর্মী সংকোচনই মোদি সরকারের মন্ত্র এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য। গেরুয়া শিবির এ নিয়ে নিশ্চয় কোনোভাবেই চিন্তিত নয়। অন্তত বিরোধীদের উচিত, এই বিষয়ে সরকারকে চেপে ধরা এবং জোরালো প্রতিবাদ করা। জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংকোচনের এই প্রবণতা আগামী দিনের জন্য ভয়াবহ ইঙ্গিত রেখে যাচ্ছে। বিলগ্নিকরণের কারণে কর্মসংকোচনের প্রকৃত ক্ষতিপূরণ নয়া কর্মসংস্থান। সরকারকে এই দিকটি নিশ্চিত করতে হবে। আর বিলগ্নিকরণ যাতে নির্বিচারে না-হয়, খেয়াল রাখতে হবে সেটিও। উন্নত পরিষেবার জন্য শুধুমাত্র বেসরকারি ক্ষেত্রকে দরাজ সার্টিফিকেট প্রদান হল একচক্ষু বিচার এবং সরকারের নিজের উপরেই নিজের অনাস্থা প্রকাশ। সমাধান আসলে স্বচ্ছতার নীতি এবং সুষ্ঠু পরিচালনা। অব্যবস্থা এবং চুরি-দুর্নীতি ঠেকাতে না-পারলে কোনও সংস্থাই বাঁচে না—এই প্রশ্নে সরকারি, বেসরকারিতে প্রভেদ কী!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ