সকল বিঘ্ন দূর করিয়া নির্বিকল্প সমাধিভূমিতে উপস্থিত হইলে জ্ঞানযোগী জীবন্মুক্ত হন এবং দেহান্তে বিদেহমুক্তি লাভ করেন। তিনি অখণ্ড শুদ্ধ ব্রহ্মজ্ঞানদ্বারা সকল অজ্ঞানের নাশ করিয়া আপনাকে স্বরূপতঃ অখণ্ড শুদ্ধ তুরীয় ব্রহ্মরূপে প্রত্যক্ষ দেখেন। ইহার ফলে তাঁহার অজ্ঞান ও ইহার কার্যস্বরূপ সঞ্চিত কর্ম এবং সংশয় ও বিপর্যয়াদি বিনষ্ট হয় এবং তিনি জীবিতাবস্থায় সকল বন্ধন হইতে মুক্ত হন। জীবন্মুক্ত ব্যক্তি সমাধি হইতে ব্যুত্থিত অবস্থায় ইন্দ্রজালের রহস্যবিদের ন্যায় জগৎকে ইন্দ্রজালবৎ মিথ্যা দেখেন। তিনি পূর্ব পূর্ব বাসনাজাত ক্রিয়মাণ কর্মসমূহ নিরপেক্ষ দ্রষ্টার ন্যায় দেহত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত ভোগ করেন। ‘যোগবাশিষ্ঠ’ মতে জীবন্মুক্ত জাগ্রৎ অবস্থায়ও সুষুপ্তবৎ বাহ্যবস্তু দেখেন না। দ্বৈতবস্তুকেও তিনি অদ্বৈত দেখেন বলিয়া তাঁহার ভোগকে ভোগ এবং দেখাকে দেখা বলা যায় না। বাহ্যতঃ অজ্ঞের ন্যায় দেহযাত্রীনির্বাহের জন্য কর্ম করিয়াও তিনি অন্তরে আত্মজ্ঞ নিষ্ক্রিয় ও নির্বিকার। তাঁহার চক্ষু থাকা সত্ত্বেও তিনি চক্ষুহীনের ন্যায়, মন থাকা সত্ত্বেও মনহীনের ন্যায় এবং প্রাণ থাকা সত্ত্বেও প্রাণহীনের ন্যায় অবস্থান করেন। জীবন্মুক্ত ব্যক্তি দেহযাত্রানির্বাহের জন্য ইচ্ছা অনিচ্ছা বা পরেচ্ছাবশতঃ সুখ-দুঃখরূপ প্রারব্ধ-কর্মফলসমূহ সম্পূর্ণ অনাসক্ত ভাবে ভোগ করিয়া থাকেন। তাঁহার ইচ্ছাও কেবল প্রারব্ধ কর্মের ফলমাত্র। এই অবস্থায় তাঁহার নিকট “সকল নামরূপ ভস্মে পরিণত হয় এবং সকল ভূতের অন্তরাত্মস্বরূপ এক ব্রহ্মমাত্র দর্শন হয়।” ইহার ফলে তিনি “অন্তরে বাহিরে সর্বত্র ব্রহ্মের প্রকাশ দর্শন করেন। দেহবিনাশের সঙ্গে সঙ্গে জীবন্মুক্ত ব্যক্তি প্রারব্ধ কর্মসমূহের বিনাশে অখণ্ড ব্রহ্মরূপে অবস্থিত হন অর্থাৎ “ব্রহ্মকে জানিয়া ব্রহ্মই হইয়া থাকেন।” তাঁহার প্রাণ উৎক্রমণ না করিয়া পরব্রহ্মে লীন হয় এবং সূক্ষ্ম ও কারণ দেহ হইতে বিমুক্ত হইয়া তিনি বিদেহ মুক্তি লাভ করেন। বেদান্তদর্শন-মতে পূর্বোক্ত জগৎসৃষ্টি প্রভৃতির আলোচনা ‘জগৎ ঈশ্বরের সৃষ্ট, তাই আমরা দেখি’ এই সৃষ্টিদৃষ্টিবাদ অবলম্বনে করা হইয়াছে। ‘সৃষ্টি আছে বলিয়াই দেখি সৃষ্টি না থাকিলে দেখিতাম না’—ইহাই এই মতবাদের মূলতত্ত্ব। এই মতে সৃষ্ট বস্তুতে ‘আমি আমার’ জ্ঞানই মানুষের আসক্তি বা বন্ধনের কারণ। এই আসক্তি বা বন্ধন হইতে মানুষকে মুক্ত করিবার উদ্দেশ্যে এই মতবাদিগণ সন্ধ্যাবন্দনাদি নিত্য নৈমিত্তিক কর্ম, পূজা পাঠ জপাদি উপাসনা ও নিত্যানিত্য বস্তুবিচার করিতে উপদেশ দেন। তাঁহারা বলেন, ইহা দ্বারা চিত্ত-শুদ্ধি হয় এবং ‘আমি আমার’ জ্ঞান বা আসক্তি নষ্ট হইয়া মোক্ষ লাভ হইয়া থাকে। বেদান্তশাস্ত্র অনুসারে এই সাধন-প্রণালী জ্ঞানযোগের অধম বা নিম্ন অধিকারীর উপযোগী।
স্বামী সুন্দরানন্দের ‘যোগচতুষ্টয়’ থেকে



