Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

জঙ্গলমহলের পিটি ঊষা হতে চায় ছোট্ট বৃষ্টি, রাজ্যস্তরে প্রাথমিকের ২০০ মিটার ইভেন্টে অংশগ্রহণ

জঙ্গলমহলের পিটি ঊষা হতে চায় ছোট্ট বৃষ্টি, রাজ্যস্তরে প্রাথমিকের ২০০ মিটার ইভেন্টে অংশগ্রহণ
  • ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
রাজদীপ গোস্বামী, মেদিনীপুর:  দিদি ধ্যান, দিদি জ্ঞান, দিদিই তার সবকিছু। দিদির নামে ঘুমোতে যায়। দিদির নামে ঘুম ভাঙে। জীবনজুড়ে শুধুই দিদি। 
Advertisement
সেই ‘দিদি’টি আসলে কে? ছোট্ট মুখে জঙ্গলমহলের বৃষ্টি জবাব দেয়—‘কেন পিটি ঊষাকে আপনারা চেনেন না? আমি ওই দিদির মতোই হতে চাই।’ 
জঙ্গল লাগোয়া কুয়াবুড়ি গ্রাম। মেদিনীপুর সদর ব্লকের অন্তর্গত। গ্রামের ভিতর এখনও মোরাম রাস্তা। ঢালাই হয়নি। রাস্তার ধারে ছোট্ট মাটির বাড়ি। স্থানীয় লোকজন চিনিয়ে দিলেন, এটাই বৃষ্টি সিংহের ঘর। অভাবের ছাপ বাড়ির চতুর্দিকে। বাবা, মা,  ঠাকুমা দিন মজুর। দিন আনি দিন খাইয়ের সংসার। বৃষ্টিকে পুষ্টি জোগানোর সামর্থ্য নেই পরিবারের। বেশিরভাগ দিন সে স্কুলে যায় পান্তাভাত খেয়ে। নয়াগ্রাম প্রাইমারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে বৃষ্টি। 
পারলে ছুটতে ছুটতে স্কুলে যেতে চায় সে! সেই ছুটও যেন হওয়া চাই পিটি ঊষার মতোই। আসলে বৃষ্টির স্বপ্ন একটাই—ফাস্ট…আরও ফাস্ট বৃষ্টি। ঝড়ের গতিবেগকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায় সে। ঠিক যেভাবে দিদি চেয়েছিলেন। পেরেছেন তিনি। তাকেও পারতে হবে। অভাব কোনও বাধা নয়। নিষ্ঠার সঙ্গে অনুশীলনে বৃষ্টির তুখোড় আত্মবিশ্বাস। তার উপর ভর করেই জীবনে প্রথম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে সে। সার্কেল লেভেল, সাব ডিভিশন লেভেল, জেলা লেভেলে জয়ী হয়ে এবার প্রাথমিকের রাজ্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। ‘খ’ বিভাগের ২০০ মিটার ইভেন্ট। বৃষ্টির লক্ষ্য, প্রতিযোগিতায় সেরা হয়ে জীবনের দৌড় শুরু করা। ছেলেবেলার একটা শখ পুরণ করা—‘বাবার কাছে আবদার করেছি, টুর্নামেন্টে সেরা হলে একজোড়া লাইটিং জুতো আমাকে কিনে দিতে হবে।’  
দৌড়চ্ছে বৃষ্টি—স্কুল ময়দানে, বাড়ির পাশের মাঠে ও রাস্তায়। এটাই তার অনুশীলন। প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। খিদের জ্বালায় পেট কুঁকিয়ে উঠলেও দমে যায় না সে। যাকে বলে একেবারে কঠোর সাধনা। বৃষ্টির এই পিটি ঊষা হয়ে ওঠার আশার আলো দেখছেন স্থানীয়রাও। গ্রামের মাঠে সে দৌড় শুরু করলে সেখানে চলে যান অনেকেই। বৃষ্টিকে উৎসাহ দেন। হাততালি দেন। তাঁদের কেউ কেউ বুধবার বলছিলেন, ‘এখনকার শৈশব তো মোবাইলে মুখ গুঁজে থাকে সারাক্ষণ। বৃষ্টি অবশ্য সেই তালিকায় পড়ে না। একটু ফুরসৎ পেলেই চলে আসে মাঠে।’
দৌড়চ্ছে বৃষ্টি। বাড়ির উঠোনও তার অনুশীলনের মাঠ। ঝড়ের বেগে কয়েক পাক দৌড়ে থামল সে। থেমেই ফুঁপিয়ে কান্না। মুখে আধো আধো কথা—‘আমাকে পারতেই হবে। টুর্নামেন্টে অংশ নিতে স্কুলের শিক্ষকরা সাহায্য করেছেন। আমাকে কী সব কিনে দিয়ে বলেছেন, এগুলো খাবি। শক্তি বাড়বে। আরও জোরে দৌড়তে পারবি। মাঠে শিক্ষকদের মান রাখতেই হবে।’ বৃষ্টির কথা শুনে নয়াগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিপ্লব আর্য হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘ওর কতটুকুই বা বয়স। আসলে, ওকে প্রোটিন জাতীয় কিছু খাবার কিনে দিয়েছি। ওর উপর আমাদের ভরসা রয়েছে। ওর প্রতিভা রয়েছে। একেবারে ছোটবেলা থেকেই ওকে ভীষণ স্পিডে দৌড়তে দেখেছি। ও পারবে। আমাদের স্কুলের মুখ রাখবে।’ প্রশাসনের এক আধিকারিকও বলেছেন, বৃষ্টিকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার নামানোর ইচ্ছে রয়েছে। 
দৌড়চ্ছে বৃষ্টি। খালি পায়ে দৌড়তে বেশ সমস্যা হচ্ছিল তার। বাবা গৌতম সিংকে বলেছিল একজোড়া জুতো কিনে দিতে। সামর্থ্যে কুলোয়নি। পরে দিদিমা রিতা সিংয়ের কাছে আবদার করে। মাসের প্রথম সপ্তাহে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পেয়েই দিদিমা ছুটেছেন জুতোর দোকানে। নাতনিকে কিনে দিয়েছেন একজোড়া জুতো।
অতঃপর, দৌড়চ্ছে বৃষ্টি। জঙ্গলমহলের পিটি ঊষা হতে চায় সে। 
(বৃষ্টি সিং ও তাঁর পরিবার।-নিজস্ব চিত্র )
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ