নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: আজকাল দোকানের শো কেসের দিকে চোখ পড়লেই দেখা যায়, থরে থরে সাজানো রংবেরঙের টেট্রা প্যাক। কোনওটাতে লস্যি, কোনওটায় ফ্রুট জুস, কোনওটায় আবার নরম পানীয় কিংবা দুধ। মানুষ সেই টেট্রা প্যাকে ভরা পানীয় খেয়ে প্যাকেটটি ছুড়ে ফেলে দেন আবর্জনার স্তূপে। এবার থেকে খালি টেট্রা প্যাকের আবর্জনার স্তূপে স্থান পাওয়ার দিন শেষ। ঝাড়গ্রামের ভূমিপুত্র গবেষক ডঃ শান্তনু ভৌমিক টেট্রা প্যাক থেকে তুলো তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করে সাড়া ফেলে দিয়েছেন দেশে-বিদেশে। কার্পাস তুলোর বিকল্প হতে পারে টেট্রা প্যাক থেকে তৈরি এই তুলো। তাঁর এই আবিস্কারকে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। ইতিমধ্যে ভাঙরের একটি সংস্থা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে তুলো তৈরি শুরুও করে দিয়েছে। যা বালিশ ও সোফার কুশনে ব্যবহার করা হচ্ছে। কলকাতার জার্মান কনস্যুলেট সংস্থাটিকে ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে।
শান্তনুর আদিবাড়ি ঝাড়গ্রামের কদমকাননে। ইদানীং তামিলনাড়ুতে অধ্যাপনা করলেও ছুটি পেলেই চলে আসেন বাড়িতে। তাঁর দাদু ছিলেন জেলার নামী চিকিৎসক। শান্তনুর পড়াশোনা খড়্গপুরের সাউথ ইস্টার্ন রেলওয়ে বয়েজ হাইস্কুলে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, রুরকি থেকে পিএইচডি করেছেন। নেদারল্যান্ডের ডেলফ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে এয়ারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অ্যাসোসিয়েট অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। কানাডার রয়্যাল মিলিটারি কলেজে গবেষক হিসেবে কাজ করে বিশ্বের বিজ্ঞানী মহলে পরিচিতি লাভ করেন। দেশের টানে সিঙ্গাপুর সরকারের সায়েন্স টেকনোলজি অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের কাজ ছেড়ে ফিরে আসেন। বর্তমানে তামিলনাড়ুর অমৃত বিশ্ব বিদ্যাপীঠমে এয়ারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। পাশাপাশি ভারত সরকারের একাধিক গবেষণামূলক কাজে জড়িত। তাঁর বেশকিছু আবিস্কার দেশের সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁর আবিষ্কার ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলে দিয়েছে। ২০১৮ সালে সুইস ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন থেকে পেয়েছেন ‘ইন্টার ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক এক্সচেঞ্জ রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড’। ইউনেস্কো সেন্টার ফর পিস থেকে ২০২২ সালে পেয়েছেন ‘বেস্ট ইনভেন্টর অ্যাওয়ার্ড’। জাতীয়স্তরে ২০১৭ সালে ইনস্টিটিউট অব পালমোকেয়ার থেকে ‘প্রফুল্লচন্দ্র রায় রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন।
নিজের বাড়িতে বসে ডঃ ভৌমিক বলেন, বাসে যেতে যেতে এক জায়গায় লস্যি ও ফ্রট জুসের ফেলে দেওয়া প্যাকেট জমে থাকতে দেখি। পরিবেশ দূষণ রোধে এগুলো ব্যবহার করে কিছু করার ভাবনা মাথায় আসে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর সাফল্য আসে। দেশের সরকার চিঠি পাঠায় এই উদ্ভাবন নিয়ে কিছু করার জন্য। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ১০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণও রোধ হবে। তিনি বলেন, দেশের টানে বিদেশ থেকে এখানে ফিরে এসেছিলাম। ছুটি পেলেই ঝাড়গ্রামে চলে আসি। ছোটবেলার মতোই এখানকার পাহাড়ে জঙ্গলে একা একা ঘুরে বেড়াই। জামবনী কলেজের অধ্যাপক পরিবেশবিদ প্রণব সাউ বলেন, ডঃ শান্তনু ভৌমিক একজন প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী। পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁর কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওঁর গবেষণামূলক কাজের বাস্তবায়ন হোক, এই আকাঙ্ক্ষা আমাদের। ঝাড়গ্রামের ভূমিপুত্র উনি। সেটাও আমাদের কাছে গর্বের বিষয়।