নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: ঝাড়গ্রামের সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ ছিল ‘পরভা’ নৃত্য। শিব-দুর্গাকে কেন্দ্র করে এই নৃত্যানুষ্ঠান হতো। চিল্কিগড় রাজবাড়ির পৃষ্ঠপোষকতায় এই নৃত্যের প্রসার ঘটেছিল। বর্তমানে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে হারিয়ে যাওয়া এই লোকনৃত্যের পুনর্জন্ম ঘটছে।
ছৌ নাচের নাম রাজ্য ও দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কাঠিনাচ, পাইক নাচ, চাঙ্গুনাচ এখনও টিকে রয়েছে। তবে, ঝাড়গ্রাম জেলার নিজস্ব ‘পরভা’ নাচই শুধু হারিয়ে গিয়েছে। রাজ্য সরকার জেলার এই লোকনৃত্যকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। ছৌ নৃত্যের মতোই জেলার মানুষের কাছে পরভা নৃত্য একসময় জনপ্রিয় ছিল। পরভা নৃত্যের শিল্পীরা মুখ থেকে কোমর পর্যন্ত মুখোশ পড়ে নাচ করেন। নৃত্যের মূল বিষয়বস্তু শিব-দুর্গার আরাধনা। বৈশাখ মাসে শিব-দুর্গার পালাকে কেন্দ্র করে এই নৃত্যানুষ্ঠান হয়। কিম্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে একসময় এই লোকনৃত্য হারিয়ে যায়। জামবনীর চিল্কিগড় রাজবাড়ির পৃষ্ঠপোষকতায় এই নৃত্যের প্রসার ঘটেছিল। রাজবাড়ির পরভা নৃত্যানুষ্ঠানের কথা জেলার প্রবীণরা এখনও ভুলে যাননি। পাঁচবছর আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে হারিয়ে যাওয়া পরভা নৃত্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। জেলার তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরকে তিনি বিষয়টি দেখার নির্দেশ দেন। এরপরই নতুন শিল্পী দল তৈরি করা হয়। পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্য শিল্পীদের দিয়ে পরভা নৃত্যের ফাইবারের মুখোশ তৈরির ব্যবস্থা করা হয়।চিল্কিগড় রাজবাড়ির বর্তমান উত্তর পুরুষ তেজসচন্দ্র দেও ধবলদেব বলেন, এই রাজবাড়ির পৃষ্টপোষকতায় ধূমধাম করে পরভা নৃত্যানুষ্ঠান হতো। পূর্বপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র ও জগদীশচন্দ্র দেও ধবলদেবের সময় সবচেয়ে বেশি জাঁকজমক হতো। দু’শো বছর ধরে চলা রাজবাড়ির এই অনুষ্ঠান আশির দশকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে জেলার তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরকে নৃত্যের মুখোশ ও অন্যান্য সামগ্ৰী দিয়ে দেওয়া হয়। এখনও কিছু কাঠের মুখোশ রাজবাড়িতে থেকে গিয়েছে। রাজ্য সরকার নতুন করে এই নৃত্যকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। জেলার হারিয়ে যাওয়া লোকনৃত্যের পুনর্জন্ম ঘটছে। আমাদের কাছে তা সত্যিই আনন্দের।
জামবনীর পরভা নৃত্যশিল্পী পরিমল দোলাই বলেন, চিল্কিগড় রাজবাড়িতে আগে পরভা নৃত্য হতো। তখন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ পরভা দেখতে আসত। রাজ্যপাট চলে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে এই অনুষ্ঠানের অবক্ষয় শুরু হয়। রাজ্য সরকার উদ্যোগ নেওয়ায় আবার পরভা নৃত্যানুষ্ঠান হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমাদের মুখোশ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এখন পরভা নৃত্য তুলে ধরছি। অপর এক শিল্পী ভুবন খামরুই বলেন, ঝাড়গ্রাম জেলার জল-হাওয়ায় এই লোকনৃত্যের জন্ম হয়। আমাদের পূর্বপুরুষরা এই নাচ করতেন। গ্ৰামের মানুষ এই নৃত্যের মুখোশ তৈরি করতে জানত। আবার এখন পরভা নাচ হচ্ছে। মানুষের আগ্ৰহ জাগছে।
জেলার তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের আধিকারিক সন্তু বিশ্বাস বলেন, ঝাড়গ্রামের নিজস্ব পরভা নৃত্যকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলায় এই মুহূর্তে পাঁচটি পরভা নৃত্যের দল আছে। ছৌ নৃত্যের মতোই পরভার নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে বলে আশা করছি। জেলার শিল্প-পর্যটনের প্রসারেও এই লোকনৃত্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেবে।