শ্রীমা সারদাদেবীর জন্মস্থান বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটী গ্রামে। গ্রামটি শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মস্থান কামারপুকুর থেকে চার মাইল এবং কলকাতা থেকে ষাট মাইল দূরে। জয়রামবাটী গ্রাম একটি শক্তিপীঠ, কারণ এখানে শক্তিরূপিণী মা জগদম্বার জন্মস্থান। মা একে ‘শিবপুরী’ আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন এখানে তিন রাত্রি থাকলে মানুষ পবিত্র হয়।
জয়রামবাটীর সেকাল ও একাল। মায়ের সময় এ-স্থান খুবই দুর্গম ছিল। মা সাধারণত জয়রামবাটী-কামারপুকুর থেকে দক্ষিণেশ্বর-কলকাতা গিয়েছেন তেলোভেলোর হাঁটা পথ দিয়ে, বর্ধমান-উচালন রুটে ট্রেন ও গোরুর গাড়িতে অথবা বিষ্ণুপুর-জয়পুর রুটে ট্রেন ও গোরুর গাড়ি করে। দীর্ঘ এবড়োখেবড়ো মাটির রাস্তায় গোরুর গাড়ির ঝাঁকুনিতে মা কত কষ্ট পেয়েছেন, তা আমাদের এখন কল্পনার অতীত। আমরা এখন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মোটরে চেপে দু-ঘণ্টায় কলকাতা থেকে কামারপুকুর-জয়রামবাটী চলে যাই।
পথশ্রমে পরিশ্রান্তা যোগেন-মা জয়রামবাটীতে শরৎ মহারাজকে বলেন, “বাপু! এখানে আসা লোকের পক্ষে গয়া কাশী যাওয়া অপেক্ষা কঠিন ব্যাপার!” মহারাজও তৎক্ষণাৎ গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন, “এ কি গয়া কাশীর চেয়ে ছোট তীর্থ।”
প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণার স্মৃতি:
আমি যখন শ্রীশ্রীমার সঙ্গে জয়রামবাটী যেতাম গরুর গাড়ি একবার বামে একবার ডাইনে টলমল করত, আবার কখনও পিছিয়ে যেত। …আমি শ্রীশ্রীমাকে বলেছিলুম–লোকে বৃন্দাবন যাচ্ছে কত আরাম করে, আর আপনার জন্মস্থানে আসতে কি কষ্ট। শ্রীশ্রীমা বললেন, ‘এই রকমই হয়, তাতে আর কি হল?’... গরুর গাড়িতে একসঙ্গে দুজন। মাত্র যেতে পারতুম। আমিই গাড়ি থেকে নামতুম আর এভাবে প্রায় চারভাগের তিনভাগ পথই হেঁটে যেতে হয়। আর আজকাল যাতায়াত কত সহজ হয়ে গেছে।
স্বামী পরমেশ্বরানন্দ আমাদের মায়ের সময়কার জয়রামবাটীর পরিবেশ পরিবেশন করেছেন। তাঁর বর্ণনা আমাদের ধ্যানের বিষয়। আমরা কল্পনার চোখে দেখি মা কী অকৃত্রিম গ্রাম্য প্রকৃতির পরিবেশে বড় হয়েছেন:
তখনকার দিনে জয়রামবাটী গ্রাম “তেঁতুলমুড়ি” নামেও পরিচিত ছিল। গ্রামে মাত্র দু-তিনজন শিক্ষিত লোক ছিলেন, তাঁহারা বিদেশে থাকিতেন। গ্রামখানির খুবই দুরবস্থা ছিল, পথঘাট খুবই খারাপ। গ্রামের মাঝখান দিয়া যাতায়াতের পথ, সেই পথের মধ্যেই একটি নালা। বর্ষাকালে ঐ নালা জলে পরিপূর্ণ হইয়া যাইত, তাহাতে গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের ঘরবাড়ি ভাসিয়া যাইত। সেই বর্ষার জলে গ্রামের রাস্তা ও পুণ্যপুকুর সব একাকার হইয়া যাইত। কোথাও কোথাও রাস্তায় এত কাদা হইত যে অনেক সময় গরু কাদায় পড়িয়া যাইত, বাঁশ দিয়া উহাদের তুলিয়া আনা হইত।


