সংবাদদাতা, রামপুরহাট: কালীপুজোর রাতে যখন গোটা বাংলা মেতে ওঠে আলোর উৎসবে তখন বীরভূমের রামপুরহাট ও নলহাটি এলাকার দুই প্রান্তে বিরাজ করে গভীর রহস্য ও নীরবতা। একদিকে মগধের রাজা জরাসন্ধের পাতালে সাধিত গুহ্যকালী, অন্যদিকে ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসা মহিরাবন কালী—সারাবছর দেবীরূপে পূজিত হলেও, কালীপুজোর নিশিরাতে এই দুটি মন্দিরেই সম্পূর্ণ অন্ধকার নেমে আসে। হয় না কোনো সর্বজনীন কালীপুজো। প্রাচীন অভিশাপ, লোমহর্ষক ইতিহাস আর কঠোর গোপনীয়তার বেড়াজালে ঘেরা এই দুই মন্দিরের অন্দরমহল।
পুরাকালের বিখ্যাত মগধরাজ জরাসন্ধ পাতালে যে ‘গুহ্যকালী’র সাধনা করতেন, কালের নিয়মে তা একদিন হারিয়ে গিয়েছিল মাটির নিচে। পরবর্তীকালে রানি অহল্যা বাইয়ের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হওয়ার পর ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের নজর এড়াতে এই মূর্তি কাশীরাজ চৈত্য সিংয়ের হাত হয়ে গঙ্গার জলে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এরপর বাংলার দেওয়ান মহারাজ নন্দকুমার গঙ্গা থেকে মূর্তিটি উদ্ধার করে জলপথে ব্রাহ্মণী নদীর তীরে নলহাটির আকালিপুরের এক বটগাছের তলায় প্রতিষ্ঠা করেন।
কুণ্ডলীকৃত সাপের ওপর উপবিষ্টা একটি কষ্টিপাথরের বেদী সমেত কালী মূর্তি। দুটি কুণ্ডলীকৃত সাপের উপর অর্ধ পদ্মাসনে উপবিষ্ট দেবী। দেবীর ডান পা সাপের মাথা স্পর্শ করে আছে। মাথায় সহস্র নাগের ফনাযুক্ত মুকুট। গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডর মালা। দেবীর কোমরে জড়িয়ে রয়েছে সাপ। মা এখানে জরাসন্ধের গুহ্যকালী নামে খ্যাত।
এই দেবীর নিত্যভোগেও রয়েছে শতবর্ষের ঐতিহ্য- প্রতিদিন দুই কেজি আতপ চালের ভাত, ভাজা, ডাল, তরকারি এবং তেঁতুল দিয়ে মাছের টক। প্রধান পুরোহিত দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, চতুর্দশী বা রটন্তী পুজোয় ভক্ত সমাগম হলেও, কালীপুজোর নিশিরাতে এই মন্দিরে পুজোর কোনো বিধান বা চল নেই। তবে কারণ অজানা সকলের।
অন্যদিকে, ব্রহ্মাণী নদীর পাড়ে জঙ্গলঘেরা ভদ্রপুর গ্রামে মহারাজ নন্দকুমারের পুরোহিত জয়কৃষ্ণ চক্রবর্তী মহিরাবন কালীর প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করেন। কথিত আছে, বর্গী আক্রমনের শিকার হয় এই কালীমূর্তি। তারপর থেকে কোমর কাঁটা অবস্থাতেই দেবী মূর্তির পুজো হয়ে আসছে। মন্দিরের প্রবীণ সেবাইত সুপ্রিয় চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, অতীতে এখানে নিশিরাতে নিঃশব্দে কালীপুজো হওয়ার রীতি থাকলেও, কোনো এক সময় অমাবস্যার রাতে একটি ঘটনার পর থেকেই মহিরাবনের ধ্বংস শুরু হয়। সেই থেকে কালীপুজোর রাতে এখানে মায়ের কোনো পুজো হয় না। তবে কালীর নিত্য সেবা হয়। চতুর্দশী তিথিতে সম্পূর্ণ কপাট বন্ধ করে, শঙ্খধ্বনি বা মন্ত্রোচ্চারণ ছাড়াই অত্যন্ত গোপনে এই কালীর বিশেষ পুজো সম্পন্ন হয়। আলোর উৎসবের আনন্দ কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ দূরে, নলহাটির এই দুই মন্দিরে আজও যুগের পর যুগ ধরে রহস্যের চাদরে ঢাকা রয়েছে কালীপুজোর রাতের নিস্তব্ধতা।



