অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: কাটোয়া মহকুমার বেশকিছু এলাকায় ঠাকরুন নামেই পরিচিত মা কালী। বড়ো, মেজ, সেজ, ন’ ও ছোটো ঠাকরুন নামে অনেক কালীই পূজিত হন। কাটোয়ার মুস্থুলী গ্রামে বোলতলার কালী মেজ ঠাকরুন নামেই পরিচিত। এখনও মেজ ঠাকরুণকে বুড়ো শিবের সঙ্গে দেখা করিয়েই পাটকাঠির মশালের আলোতেই বিসর্জন হয়। আর কুরচি গ্রামে ন’ঠাকরুণ নামেই মা পুজো পান৷
একদিনেই প্রতিমা গড়ে পুজোর রাতেই সূর্যোদয়ের আগে বিসর্জন হয় কাটোয়ার কুরচি গ্রামের মা ন’ঠাকরুণের। অমাবস্যা শুরুর পর প্রতিমা গড়া হয়। এরপর চক্ষুদানও পুজোর দিনই সম্পন্ন হয়। বছরের পর বছর ধরে এমনই রীতিই চলে আসছে কাটোয়ায়। প্রায় এক হাত উচ্চতার ন’ঠাকরুণের পুজো ঘিরে উন্মাদনায় মাতোয়ারা হয় আশপাশের অনেক গ্রাম। এমনকি, সুদূর কলকাতা থেকেও পুজোর ডালি নিয়ে ভক্তরা চলে আসেন কাটোয়ায়। কালীপুজোই মূল উৎসব কুরচি গ্রামে।
কাটোয়া- ২ ব্লকের কুরচি গ্রামে কালী পুজোর মূল আকর্ষণ বটগাছের নীচে মা ন’ঠাকরুণের পুজো। কবে থেকে কে এই পুজো শুরু করেছিলেন তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। গ্রামের চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পুজো হলেও এখন গোটা গ্রামের মানুষেরই পুজো হয়ে গিয়েছে ন’ঠাকরুণের পুজো।
চট্টোপাধায় পরিবারের সদস্য শান্তনু চট্টোপাধ্যায় বলেন, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের সমসাময়িক কাল থেকেই ন’ঠাকরুণের পুজো শুরু হয়। আগে এসব অঞ্চলে ছিল ঘন জঙ্গল। তাই তখন মা কালীর সাধনার বড়ো পীঠস্থান ছিল এলাকা জুড়ে। তখনই কোনো এক সাধক সাধনা করতেন মা ন’ঠাকরুণের। চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পূর্বপুরুষ মুরারি মোহন চট্টোপাধ্যায় ন’ঠাকরুণের দর্শন পেয়েছিলেন। তিনি পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে মায়ের সাধনা করতেন। সেই পঞ্চমুণ্ডির আসন আজও আছে। তারপর থেকে বংশানুক্রমে এই পুজো হয়ে আসছে। শোনা যায়, একসময় ডাকাতরা নাকি ডাকাতি করার আগে ন’ঠাকরুণের কাছে পুজো দিয়ে যেতেন। চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা এখনও নিজে হাতেই মা কে ডাকের সাজ পরান। তন্ত্রমতেই মা ন’ঠাকরুণের পুজো হয়। এরপর পুজোর ভোর রাতেই সূর্যোদয়ের আগেই মা ন’ ঠাকরুণের বিসর্জন হয়ে যায়।
কাটোয়া- ২ ব্লকের জগদানন্দপুরের মুস্থুলী গ্রামে বোলতলা কালী অধিষ্ঠিতা। জানা গিয়েছে, প্রায় ৩০০ বছর ধরে চলে আসছে এই বোলতলা কালীর আরাধনা। জনশ্রুতি, অনেক বছর আগে এক সাধক ওই এলাকায় একটি বকুল গাছের নীচে মা কালীর আরাধনা শুরু করেন। তাঁর আরাধ্যা ছিলেন এই দেবী। সেই সাধকের মৃত্যুর পর প্রথমে এলাকার জমিদার এবং পরে এলাকারই এক বাসিন্দাকে পুজোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে গ্রামবাসীরা এখনও এই পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন। সাধকের মৃত্যুর পর তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী মন্দিরের কাছেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।
পাশাপাশি ‘মেজ ঠাকরুণ’ নামেও পরিচিত দেবী। মেজ ঠাকরুণের পুজোর দিন দুপুরে এলাকার মহিলার সিঁদুর খেলেন। পুজো শুরু হয় রাত ১২ টার পর। প্রতিমা রঙ করা হয় পুজোর দিন রাতেই। পুজো হয় তন্ত্রমতে। ঘোড়ানাশ গ্রামের চট্টোপাধ্যায় বাড়ির মা কালী সেজ ঠাকরুণ নামে পরিচিত। অনেক প্রাচীন এই মা কালী আগে তালপাতার ছাউনিতে পূজিত হতেন। পরে মাটির ঘর ও টিনের চালা তৈরি হয়। বর্তমানে মায়ের মন্দির হয়েছে। তান্ত্রিক মতে মায়ের পুজো হয় এখানে। বারোমাসই চলে মায়ের নিত্যসেবা।



