বর্গি হানায় আশ্রয় হারিয়েছিলেন খণ্ডঘোষের ওঁয়াড়ি গ্রামের বড়মা
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

গণেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, বর্ধমান: বর্গী হানায় একদা তছনছ  হয়ে গিয়েছিল সারা বাংলা। তার রেশ আছড়ে পড়েছিল পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষের ওঁয়াড়ি গ্রামেও। প্রায় পাঁচ শতাধিক বছর আগের সেই বর্গী হামলায় নিজের আশ্রয় পর্যন্ত হারাতে হয়েছিল ওঁয়াড়ি গ্রামের আরাধ্য দেবী বড়মাকে। তাঁর ঠাঁই হয়েছিল শ্মশান সংলগ্ন পরিত্যক্ত জায়গায়। সেখানেই দীর্ঘদিন পড়েছিলেন বড়মা। একদিন দেবী মা স্বপ্নে ওঁয়াড়ি গ্রামের বাসিন্দা বুদ্ধদেব  সরকারকে তাঁর দূরাবস্থার কথা জানান। তারপরই দেবীকে উদ্ধার করে বুদ্ধদেববাবু নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পুজোপাঠ শুরু করেন। পরে মন্দির গড়ে তিনি সেখানে বড়মাকে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে প্রতি বছর কার্তিকেয় অমাবস্যা তিথিতে কালীপুজোর দিন ওঁয়াড়ি গ্রামে ঘটা করে হয়ে আসছে বড়মায়ের পুজো। বর্গীদের মহিষাসুরের সঙ্গে তুলনা করে বড়মায়ের পুজোয় একদা মোষ বলি হত। সেসময়ে মহিষাসুর বধের উল্লাসে বড়মার সামনে লাঠি খেলায় মাতোয়ারা হতেন ওঁয়াড়ি গ্রামের হিন্দু ও মুসলিম যুবকরা। এখন মোষ বলিদান আর না হলেও পুরানো প্রথা মেনে কালীপুজোর দিন বড়মার সামনে লাঠি খেলা হয়। গ্রামের আরাধ্য বড়মাকে আঁকড়ে আজও ওঁয়াড়ি গ্রামে সম্প্রীতির অটুট বন্ধন রয়েছে।

Advertisement

ওঁয়াড়ি গ্রামে বড়মা কালী রূপে পূজিতা হলেও আদতে বড়মা হলেন দুর্গা–কালীরূপী। বড়মার প্রতিমা প্রকৃত অর্থেই নজরকাড়া। গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর সঙ্গে দুই পরী জয়া ও বিজয়াকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠিতা দুর্গা–কালীরূপী বড়মা। এলাকার বাসিন্দাদের বিশ্বাস, বড়মায়ের কাছে কেউ কিছু চাইলে দেবী তাকে নিরাশ করেন না। তাই সকলেই মায়ের কাছে মাথানত করেন।
পূর্বে গ্রামের সরকারবাড়িতে পূজিতা হতেন বড়মা। এখন তিনি পূজিতা হন ওঁয়াড়ি গ্রামের সকলের বড়মা রূপে। দেবীর মন্দিরটিও তৈরি হয়েছে বিশাল আকারে। শোনা যায়, একসময় বড়মায়ের সম্পত্তির পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে সাতশো বিঘা। সেসব এখন ইতিহাস। জানা গিয়েছে, সামান্য ৩০-৩৫ বিঘা দেবত্তর সম্পত্তি এখন রয়েছে বড়মায়ের নামে। সেই জমির আয় থেকেই সারা বছর বড়মায়ের নিত্যসেবা ও কার্তিকেয় অমাবস্যা তিথির বিশেষ পুজোপাঠ হয়। পুজো চলে সাতদিন ধরে।
পূজারী তুষার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তন্ত্রমতেই বড়মায়ের পুজো হয়। মায়ের পুজোর ভোগ অন্নে চালকলাই ভাজা ও চিনি দেওয়ার রীতি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আগে মহিষাসুর বধকে স্মরণ করে মোষ বলি হত। তবে, মোষ বলিদান এখন আর হয় না। উপাচার মেনে শুধু ছাগ, আখ ও ছাঁচিকুমড়ো বলিদান হয়। কালীপুজোর দিন থেকে শুরু করে সাতদিন ধরে চলে বড়মার বিশেষ পুজোপাঠ। বছরের অন্য দিনগুলিতে গ্রামের বাসিন্দাদের কেউ কর্মসূত্রে বাইরে থাকলেও  পুজোর সাতটি দিনের জন্য সবাই ফিরে আসেন গ্রামে। পুজোর সাতদিন উৎসব মুখর থাকে সমগ্র ওঁয়াড়ি গ্রাম। বসে বিশাল মেলা। হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও যাত্রাপালা।