আগমেশ্বরী পুজো ঘিরে আবেগে ভাসে নবদ্বীপ
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, নবদ্বীপ: বৈষ্ণবতীর্থ হিসেবে চৈতন্যভূমি নবদ্বীপের পরিচিতি থাকলেও এই প্রাচীন জনপদের ইতিহাসে শাক্ত সাধনা ও তন্ত্রচর্চারও রয়েছে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন নবদ্বীপের আগমেশ্বরী কালীপুজো। তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের স্মৃতিবিজড়িত এই পুজোকে ঘিরে আজও ভক্তদের মধ্যে রয়েছে গভীর আবেগ ও উৎসাহ। দেবীর নাম থেকে এলাকার নাম হয়েছে আগমেশ্বরী পাড়া। এখানে সারা বছর মন্দিরে নিত্যপুজো হলেও দীপান্বিতা অমাবস্যায় প্রায় ১৬ফুট উচ্চতার প্রতিমায় পুজো হয়। আর তাকে কেন্দ্র করেই এসময় তৈরি হয় বিশেষ আবহ। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ একজন উচ্চস্তরের তন্ত্রসাধক ও পণ্ডিত ছিলেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ঘরে ঘরে দক্ষিণাকালী বা শ্যামারূপে দেবীর আরাধনার যে প্রসার ঘটেছে তা শুরুর লগ্নে তাঁর  ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে আগমেশ্বরী কালীপুজোর বিশেষত্ব শুধু প্রাচীনত্বে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৈষ্ণব ও শাক্ত ঐতিহ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন। কৃষ্ণানন্দ নিজে শাক্ত সাধক হলেও তাঁর বাবা মহেশ্বর গৌড়াচার্য এবং ভাই মাধবানন্দ ছিলেন বৈষ্ণব ও গোপালের উপাসক। সেই পারিবারিক ঐতিহ্যের ছাপ রয়েছে আগমেশ্বরী মাতার পুজোতেও। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, গোপাল বিগ্রহকে সামনে রেখে মায়ের পুজো করা হয়। দেবীর বাঁ দিকে থাকেন গোপাল, ডান দিকে নারায়ণ শিলা। আর সামনে মহাকালের মাথার কাছে স্থাপন করা হয় যন্ত্র। পুজোর আচার-অনুষ্ঠানে মিশে রয়েছে বৈষ্ণব ও শাক্ত ভাবধারা। কার্তিক মাসের পঞ্চমী থেকেই শুরু হয় প্রতিমা নির্মাণের বিশেষ পর্ব। মন্দিরের নিয়ম মেনে ওই দিন তৈরি করা হয় পাঁচ পোয়ার ছোট খড়ের মূর্তি। একাদশী পর্যন্ত মন্দিরে ওই মূর্তিতেই চলে নিত্যপুজো। একাদশীতে বড় প্রতিমার কাঠামোয় খড় বাঁধার কাজ শুরু হলে ছোট মূর্তিটিকে বড় প্রতিমার বুকে স্থাপন করা হয়। চতুর্দশীতে তৈরি হয় প্রতিমার মুখমণ্ডল। অমাবস্যায় আঁকা হয় দেবীর চোখ। প্রতিমা তৈরির সময় মৃৎশিল্পী শুদ্ধ বস্ত্র পড়েন। দীপান্বিতা অমাবস্যার রাতে শুরু হয় পুজো। চলে ভোর পর্যন্ত। দেবীর ভোগেও রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। অড়হর ডালের খিচুড়ি, কচুশাক, মোচা, এঁচোড় এবং চালতার টক নিবেদন করা হয় মাকে। পুজোর পরের দিন দুপুরে বেহারাদের কাঁধে চেপে বিসর্জনের উদ্দেশ্যে রওনা হন দেবী। প্রাচীন এই কালীমন্দির ইতিমধ্যেই হেরিটেজের স্বীকৃতি পেয়েছে। বংশপরম্পরায় দীর্ঘদিন ধরে সান্যাল পরিবারে এই পুজোর দায়িত্ব পালন করে আসছে। সেই প্রাচীন রীতি মেনে আজও পুজোর আয়োজন করা হয়। পরিবারের সদস্যা পূরবী সান্যাল বলেন, মা নিজের পুজোর খরচ নিজেই ব্যাবস্থা করেনেন। ভক্তরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পুজো দেন।  কালীপুজোর দিন দুপুরে পঞ্চমুণ্ডির আসনে তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশকে স্মরণ করে পুজো নিবেদনের রীতি রয়েছে। নিশিরাতে হয় মৃন্ময়ী প্রতিমার পুজো।  দীপান্বিতার সন্ধ্যায় দেবীর কাছে প্রদীপ জ্বালাতে ভক্তরা ভিড় করেন। নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শান্তিরঞ্জন দেব বলেন, কালীতন্ত্রে দক্ষিণাকালীর যে মূর্তির বর্ণনা রয়েছে, সেই রূপকেই কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। জানা যায়, সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে, ১৬০০ থেকে ১৬১০ সালের মধ্যে আগমবাগীশের জন্ম। ১৬৩৫ থেকে ১৬৪৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি তন্ত্রসার রচনা করেন। এই গ্রন্থের মাধ্যমে ঘরে ঘরে সহজ-সরল পদ্ধতিতে দেবীর আরাধনার পথ দেখিয়েছিলেন আগমবাগীশ। আগমেশ্বরী মন্দিরের বর্তমান স্থানটিই ছিল কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের সাধনক্ষেত্র। সবমিলিয়ে মনে করা হয়, নবদ্বীপের বৈষ্ণব ঐতিহ্যের পাশাপাশি শাক্ত সাধনার ইতিহাসও বহন করে চলেছে আগমেশ্বরী কালীপুজো।

Advertisement