পিনাকী ধোলে ও বলরাম দত্তবণিক: সিউড়ি ও রামপুরহাট: বীরভূম জেলা থেকে এবার রাজ্য মন্ত্রিসভায় স্থান পেলেন দু’জন পূর্ণমন্ত্রী। সোমবার লোকভবনে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন সিউড়ির বিধায়ক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় এবং ময়ূরেশ্বরের বিধায়ক দুধকুমার মণ্ডল। দপ্তর বণ্টন না হলেও বীরভূম জেলা থেকে একসঙ্গে দু’জন পূর্ণমন্ত্রী হওয়ায় জেলার রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই বদলে গেল। দুই নেতার এই উত্থানে বীরভূমের গেরুয়া শিবিরে এখন খুশির হাওয়া।
সিউড়ির ঘরের ছেলে জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। এলাকায় যাঁর ডাকনাম ‘তীর্থ’। একসময় সাংবাদিকতার ‘নিরাপদ’ কেরিয়ার ছেড়ে পা রেখেছিলেন রাজনীতির তপ্ত ময়দানে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে বিজেপিতে যোগ দিয়ে টিকিট পেয়েছিলেন। সেবার অবশ্য জয়ের মুখ দেখেননি। কিন্তু মাথা উঁচু করেই লড়াইয়ের ময়দানে টিকেছিলেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতাকে মর্যাদা দিয়ে দল প্রথমে তাঁকে রাজ্য সাধারণ সম্পাদক এবং পরে রাজ্য সহ-সভাপতি পদে বসায় দল। এবারের নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থীকে বিপুল ভোটে হারিয়ে বীরভূমের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে বিধানসভায় প্রবেশ করেছেন তিনি।
জগন্নাথ পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতেই খুশির হাওয়া সিউড়িতে। এদিন শপথগ্রহণের পরই সিউড়ির চৈতালি মোড়ে আবির খেলে আনন্দে মাতেন বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। পাড়ার ছেলে রাজ্যের মন্ত্রী হওয়ায় সন্ধ্যায় নুরুইপাড়া পূর্বপল্লি ক্লাবের সদস্যরা পথচারীদের মিষ্টিমুখ করান। এদিন জগন্নাথবাবু বলেন, আমাকে দল যে দায়িত্বই দেবে, তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব। পশ্চিমবঙ্গের হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনে পুনর্নির্মাণ করাই আমাদের আসল লক্ষ্য।
বীরভূমের মাটিতে কার্যত চার দশক ধরে বিজেপির হয়ে লড়ছেন ‘লড়াকু’ নেতা দুধকুমার মণ্ডল। জেলায় যখন বিজেপির ঝান্ডা ধরার লোক পাওয়া যেত না, অনুব্রত মণ্ডলের দাপটে বিরোধীরা তটস্থ থাকত, তখন বুক চিতিয়ে লড়াই করেছিলেন এই আরএসএস নেতা। ১৯৮৮সালে প্রথমবার ময়ূরেশ্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য হওয়া দুধকুমার আজ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয়। ২০১২ সালে অবিভক্ত বীরভূমে সাংগঠনিক জেলা সভাপতি হওয়ার পর তাঁর আপসহীন মেজাজ আজও আদি কর্মীদের কাছে বড় আবেগ। জেলার রাজনীতিতে যে সময়ে অনুব্রত মণ্ডলের দাপটে বিরোধীরা কোণঠাসা, সেইসময় বুক চিতিয়ে ‘কেষ্ট-বাহিনী’র সঙ্গে সমানে টক্কর দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জেলার পাল্টা রাজনৈতিক মুখ। একাধিকবার বিধানসভা ও লোকসভা ভোটে হারলেও এই প্রথম তিনি বিধানসভার চৌকাঠে পা রেখেই সরাসরি ক্যাবিনেটে জায়গা করে নিলেন।
ময়ূরেশ্বরের বিজেপি নেতা মনোজ শর্মা বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দলের সংগঠন ধরে রাখার বড় স্বীকৃতি পেলেন দুধকুমারবাবু। ময়ূরেশ্বরের বাসিন্দা তথা বোলপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডল বলেন, এই প্রথম ময়ূরেশ্বর থেকে কেউ মন্ত্রী হলেন। এবার অবহেলিত এই এলাকার রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্য ও বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। মন্ত্রী হয়েই নিজের পুরনো মেজাজে দুধকুমার হুঙ্কার দিয়ে বলেন, তৃণমূলের আমলে মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি হয়েছে। সেগুলির বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই কড়া পদক্ষেপ নেব। পাশাপাশি নিজের ঘরের মাঠ ময়ূরেশ্বরের উন্নয়নই হবে অগ্রাধিকার।
সবমিলিয়ে, দুই হেভিওয়েট মন্ত্রীর হাত ধরে এবার বীরভূমের সার্বিক উন্নয়ন হবে বলেই আশাবাদী সাধারণ মানুষ। জেলার অবহেলিত শিক্ষা ব্যবস্থা, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ভোলবদল ঘটাতে দুই নতুন মন্ত্রী বিশেষ উদ্যোগী হবেন বলে আশা করছে জেলাবাসী। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দাবি মেনে রেলপথের সম্প্রসারণ ও নতুন প্রকল্পের সুবিধা জেলায় আসার স্বপ্ন দেখছে জেলাবাসী। দুই মন্ত্রী। জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় ও দুধকুমার মণ্ডল।