নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বৃষ্টি যেন থামছেই না! টানা এক-দু’ঘণ্টা মুষলধারে বৃষ্টি হলে তাও এক কথা! বৃষ্টি থামলে আবার কাজে বেরনো যায়। স্বাভাবিক গতি ফিরে পায় জনজীবন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি হয়ে চলেছে দিনভর। কয়েক বছর আগেও বর্ষাকালে বৃষ্টির চরিত্র এমন ছিল না। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করলে খাতায়কলমে বর্ষাকাল শুরু হয়। কমবেশি বৃষ্টি চলে রাজ্যের সর্বত্র। কিন্তু গত দু’-তিন বছরে বৃহত্তর কলকাতা অর্থাৎ দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলিতে বর্ষাকালে বৃষ্টির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আবহাওয়াবিদরা জানাচ্ছেন, এই বৃষ্টিপাত মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে নয়, বরং নিম্নচাপের কাঁধে চেপে হাজির হচ্ছে। তাই এই বৃষ্টির চরিত্র আলাদা।
সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বৃষ্টিপাতের ২২১.৬ মিমি বৃষ্টি হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুন-জুলাইয়ে হয় ৩৪১ মিমি বৃষ্টিপাত। আর চলতি বর্ষার মরশুমে এখনও পর্যন্ত ৪৯৬ মিমি বৃষ্টি হয়েছে এই জেলায়। উত্তর ২৪ পরগনার ক্ষেত্রে ২০২৩ সালে ১৯৭ মিমি, ২০২৪ সালে ২৭৮ মিমি এবং চলতি মরশুমে ৪৯৭ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। কলকাতা ও হাওড়ার পরিসংখ্যানও এই প্রবণতা স্পষ্ট করেছে। বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে যাওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূতত্ত্ববিদ সুজীব কর বলছিলেন, ‘মৌসুমি বায়ুর থেকে আমাদের যেভাবে বৃষ্টি পাওয়ার কথা, তা আমরা পাচ্ছি না। আমরা পাচ্ছি নিম্নচাপের বৃষ্টি। সেই নিম্নচাপ দক্ষিণবঙ্গ দিয়ে প্রবেশ করে ঝাড়খণ্ড হয়ে মধ্যভারতের দিকে চলে যাচ্ছে। তাই দক্ষিণবঙ্গের বৃষ্টির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।’ বৃষ্টিপাতের কারণ আলাদা হওয়ার কারণে এর চরিত্রেও বদল এসেছে বলে মনে করেন তিনি। কীরকম চরিত্র বদল? উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, এবার যেমন দেখা যাচ্ছে, টানা বৃষ্টি হয়ে চললেও চারপাশের বাতাস ঠান্ডা হচ্ছে না। ভ্যাপসা গরম থাকছে। কিন্তু এত ঘনঘন নিম্নচাপের কারণ কী? সুজীববাবু বলেন, ‘অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তন। আরও একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য। রাজস্থানে থর মরুভূমিতে বৃক্ষরোপণের ফলে ভারতে নিম্নচাপের বেল্ট ভেঙে গিয়েছে। মূল নিম্নচাপ হওয়ার কথা থর মরুভূমির উপর। এসব কারণে মৌসুমি বায়ুর ছন্দ একেবারে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাই বৃষ্টির জন্য নিম্নচাপের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৌসুমি বায়ুর ঢোকার পর যে ‘ক্ল্যাসিকাল মনসুন’ এতকাল দেখা গিয়েছে, গত প্রায় ৭-৮ বছর বৃহত্তর কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশে তার দেখা নেই। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের অধিকর্তা হাবিবুর রহমান বিশ্বাস বলেন, ‘আগের বছর মনসুন অনেকটা পরে এসেছিল। এই বছর মোটামুটি ঠিক সময় এসেছে। সেই সঙ্গে এবছর অনেকগুলি নিম্নচাপ হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি বেশি হচ্ছে। গত বছর নিম্নচাপের সংখ্যা কম ছিল। এবার ইতিমধ্যে পাঁচটা হয়ে গিয়েছে।’
এদিকে, বর্ষার ধরন বদলে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও। দিনভর ঝিমঝিমিয়ে বৃষ্টিতে শহরের রাস্তাঘাট অনেক দ্রুত বেহাল হচ্ছে। জলের তলায় চলে যাচ্ছে এলাকা। মফসসলে চাষের জমিও জলমগ্ন হচ্ছে। এসব কারণে কাঁচা সব্জির দাম বাড়ছে হু হু করে। চিরাচরিত বর্ষা কি তবে হারিয়েই গেল? সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন!