Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এবার বাংলাদেশের পালা!

পহেলগাঁও কাণ্ডের অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের নতুন করে অক্ষ ঝালিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিচলিত করে রেখেছিল দিল্লিকে।

এবার বাংলাদেশের পালা!
  • ২২ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পহেলগাঁও কাণ্ডের অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের নতুন করে অক্ষ ঝালিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিচলিত করে রেখেছিল দিল্লিকে। পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর প্রধান সহ একটি প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর করা দিয়ে যার শুরু। অতি সম্প্রতি পনেরো বছরের বরফ কাটিয়ে পাকিস্তানের বিদেশ সচিব আম্মা বালোচ বাংলাদেশ সফর করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানোর যৌথ ঘোষণা করেছিলেন। ভারত এবং পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এবং উদ্ভূত উত্তেজনার পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও ‘দৃঢ়’ করার বার্তা দিয়েছিল ইসলামাবাদ। এতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাড়বাড়ন্ত হওয়া মৌলবাদী সংগঠনগুলির সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়বে, এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি নয়াদিল্লির চোখ এড়ায়নি। বাংলাদেশের জমিকে ব্যবহার করে অতীতের মতো ফের সীমান্তে আঘাত হানার কোনও বড় পরিকল্পনা পাকিস্তান করতে পারে বলে ইতিমধ্যেই সতর্ক ভারত। নয়াদিল্লির বক্তব্য, যে পাকিস্তান সরকার নিজেই দেশবাসীকে রুটি খাওয়াতে পারে না, ভারত-বিরোধিতা দেখাতে গিয়ে তার উপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভর করা মূর্খামি ছাড়া কিছু নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারতের সঙ্গে ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায়’ নিজেদের অর্থনৈতিক বিপর্যয়কেই ডেকে আনছে বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্ব। তাতে বাংলাদেশের নাগরিকদেরই দুরবস্থা বাড়বে।

Advertisement

সম্প্রতি তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানির জন্য বাংলাদেশকে ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ সুবিধা দেওয়া বন্ধ করেছে ভারত। এরপর বাংলাদেশের তরফে ঘোষণা করা হয়েছিল, ভারত থেকে স্থলপথে সুতো আমদানি বন্ধ করছে তারা। ভারতকে এই পণ্য পাঠাতে হলে তা পাঠাতে হবে সমুদ্রপথে। ইউনুস সরকারের সেই সিদ্ধান্তের পর পাল্টা পদক্ষেপ নেয় ভারতও। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের অধীনে থাকা বৈদেশিক বাণিজ্য দপ্তর (ডিজিএফটি)-এর তরফে বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়েছে, ফল, ফলের স্বাদযুক্ত কার্বনেটেড পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার (কেক, চিপ্‌স বা স্ন্যাক্স), তুলো, সুতির পোশাক, প্লাস্টিক এবং পিভিসি দিয়ে তৈরি জিনিস, রঞ্জকের মতো পণ্য বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে প্রবেশ করতে পারবে না। স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে ভারতের যে সব অঞ্চল, যেমন— অসম, মিজোরাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংড়াবান্ধা ও ফুলবাড়ি শুল্ককেন্দ্র দিয়ে এইসব পণ্য প্রবেশ করতে পারবে না। তবে বাংলাদেশ থেকে আসা মাছ, এলপিজি, ভোজ্যতেলের উপর কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। অন্যান্য পণ্য পাঠাতে গেলে বাংলাদেশকে সমুদ্রপথে পাঠাতে হবে। কার্যত ভারত দিয়ে ঘেরা বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ বাণিজ্য হয় সড়কপথে। গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ-এর (জিটিআরআই) একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, স্থলবন্দর বন্ধ করার ফলে বাংলাদেশের ৪২ শতাংশ আমদানিতে কোপ পড়েছে। জিটিআরআই-এর পরিসংখ্যান বলছে, ভারতীয় মুদ্রায় এই সমস্ত পণ্যের বার্ষিক আমদানির মোট মূল্য সাড়ে ছ’হাজার কোটি টাকার বেশি। সাধারণত সমুদ্রপথের তুলনায় সড়কপথে বাণিজ্যে খরচ অনেক কম হয়। এখন থেকে এইসব পণ্য সমুদ্রপথে ভারতে পাঠাতে গেলে বাংলাদেশের খরচ পড়বে অনেক বেশি। আর্থিকভাবে দুর্বল বাংলাদেশের জন্য যা বড়সড় ধাক্কা। বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকা চীনের উপর যে চড়া শুল্ক আরোপ করেছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের এই পদক্ষেপ তার চেয়েও কঠোর।
কিন্তু ভারতকে এত কড়া পদক্ষেপ নিতে হল কেন? আসলে, এক-একটি ঘটনা অনেক সময়ে অনেক ধোঁয়াশা কাটিয়ে দেয়। ভারত-পাক সংঘাত তেমনই ভারতীয় কূটনীতিতে একটি হিমালয়সমান চ্যালেঞ্জকে বেআব্রু করে দিয়েছে। কত বড় সেই চ্যালেঞ্জ, সেটা বোঝার সহজতম উপায় হয়তো বাংলাদেশের প্রচারমাধ্যমে কীভাবে কাশ্মীরে জঙ্গি হানা ও তার পরবর্তী ঘটনাসমূহ বিবৃত হচ্ছে, তা দেখা। বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলির দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ভারত-পাক সংঘাতের আবহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের সিংহভাগ কতটা প্রসন্ন। এবং সেদেশে ভারত বিরোধিতার মাত্রা কতটা ছাড়িয়েছে। নয়াদিল্লির কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, ভারতের নতুন বিপদ এখন শত্রুপরিবৃত প্রতিবেশী কূটনৈতিক বলয়। পাকিস্তানের প্রতি চীন ও তুরস্কের অবারিত সমর্থনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের চরম ভারত-বিরোধিতা। চীন-প্রভাবিত ছোট দেশগুলিকে মাথায় রাখলে সহজেই বোঝা যায় যে ভারত এই মুহূর্তে কীভাবে একটি পূর্ণ শত্রুবলয়ের মধ্যে আবদ্ধ। অতএব, বাণিজ্যে ঘা দিয়ে ভাতে মারা ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই। সেই কাজটিই করেছে নয়াদিল্লি!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ