নিজস্ব প্রতিনিধি, মেদিনীপুর: খড়গপুর স্টেশনের একপাশে বসে কান্নাকাটি করছিল একটি ছোট্ট শিশু। খিদের জ্বালায় ছটফট করছিল। রেল পুলিসের আধিকারিকদের নজরে আসে বিষয়টি। স্টেশন চত্বর থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছিল। সেই ছোট্ট হালিমা যাচ্ছে ইতালি। মঙ্গলবার সে দেশের এক চিকিৎসক দম্পতি তাঁকে দত্তক নিল। বর্তমানে হালিমা পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। দত্তক নেওয়ার পাশাপাশি ইতালি থেকে আসা সেই দম্পতি ভূয়সী প্রশংসা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের। তবে ছোট্ট হালিমা চলে যাওয়ায় মন খারাপ প্রশাসনের আধিকারিক থেকে হোম কর্তৃপক্ষের। প্রশাসনের আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, এখনও পর্যন্ত জেলা থেকে ৬২ জনকে দত্তক নিয়েছে নানা পরিবার। তাঁদের মধ্যে ৯ জনকে ইতালি, বেলজিয়াম সহ বিদেশি দম্পতিরা দত্তক নিয়েছে। ৪৪ জন দেশের মধ্যে আর বাকি ৯ জন শিশুর আত্মীয় বা পরিজনদের দত্তক দেওয়া হয়েছে।
এদিন অতিরিক্ত জেলাশাসক (ডেভেলপমেন্ট) কেম্পা হোনাইয়া বলেন, সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া মেনেই ইতালির পরিবারকে দত্তক দেওয়া হল। জেলার আধিকারিকরা কঠোর পরিশ্রম করে এই কাজ করছেন। ছোট্ট শিশু কন্যা নতুন জীবন ও পরিবার পাচ্ছে। সকলের সহযোগিতা ছাড়া এই কাজ করা সম্ভব হতো না। জেলার মানুষের পাশে সর্বদা প্রশাসন থাকবে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১২ সাল নাগাদ খড়গপুর স্টেশনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল হালিমা। খিদের জ্বালায় মাঝে মধ্যেই সে কেঁদে উঠছিল। বিষয়টি নজরে আসে রেল পুলিসের। রেল পুলিসের আধিকারিকরা জানতে পারে, অজ্ঞাত কারণে হালিমা’কে স্টেশনে ফেলে চলে গিয়েছে পরিবারের সদস্যরা। এরপর রেল পুলিসের তরফে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। জেলা প্রশাসনের আধিকারিকরা দ্রুত ব্যবস্থা নেন। তাঁরা জানতে পারেন হালিমার বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলায়। প্রায় তিন বছর ধরে মুর্শিদাবাদ গিয়ে হালিমার বাড়ির খোঁজ চালানো হয়। কিন্তু পরিবারের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। সেই সময় থেকে জেলার হোমই ছিল হালিমার ঠিকানা। ২০১৯ সাল থেকে ইতালি দেশের রেগিও এমিলিয়া শহরে বাসিন্দা ফিলিপো মর্শিয়ানি ও এলিনা রিঘি সন্তান দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা আফা আফা’ র (অথোরাইসড ফরেন অ্যাডাপশন এজেন্সির) সঙ্গে যোগাযোগ করে। এরপর একাধিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁরা হালিমাকে দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অর্থোপেডিক সার্জেন ও কার্ডিয়াক সার্জেন দম্পতি জানায়, আগে রাজস্থান গিয়েছি, কিন্তু কলকাতায় আসা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে এসে দারুন এক অভিজ্ঞতা হল। প্রশাসনের কাজ দেখে আমরা আপ্লুত। তাঁরা আরও বলেন, হালিমাকে ডাক্তার করতেই চাই। তবে তার চেয়ে বড় কথা ভালো মানুষ গড়ে তুলব। সারা দিন একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা হল।
হালিমা জানায়, মন খারাপ করছে। অনেক দূর চলে যাব শুনেছি। সবাই খুব ভালো দেখভাল করেছে। সবাইকে মনে থেকে যাবে। এখানে অনেক খেলাধুলো ও পড়াশোনা করতাম। একটা অ্যালবাম দেওয়া হয়েছে। ওটা সঙ্গে থাকবে। অন্যদিকে, মঙ্গলবারই ৭ বছরের এক শিশুপুত্রকে দত্তক নিল উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসতের এক শিক্ষক দম্পতি। জানা গিয়েছে, দেবাদিত্য পাল নামে ওই শিশুকে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার এক এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। ডেবরার একটি হোমে সে থাকত। বারাসাতের বাসিন্দা তপন পাল ও রমা পাল দাস কয়েক বছর আগে থেকেই দত্তক নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।