নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া ও চুঁচুড়া: ‘সকাল সাড়ে ৯টায় ট্রেনে উঠেছিলাম। সাড়ে চার ঘন্টা পর হাওড়া ঢুকতে পারলাম। যা অবস্থা দেখছি, নতুন চাকরিটা বোধ হয় থাকবে না!’ পৌনে ২টো নাগাদ বর্ধমান লোকাল থেকে নেমে হাওড়া স্টেশনের ৬ নম্বর প্ল্যাটফর্ম দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে গেলেন চন্দননগরের সুমিত দে। সোমবার রাতভর বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলার সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগের অন্যতম লাইফলাইন রেলের হাওড়া শাখা। বর্ধমান মেইন লাইন তো বটেই, কর্ড লাইনের ট্রেনগুলিও এদিন দুপুর পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘন্টা দেরিতে ঢুকেছে হাওড়ায়। লিলুয়া, বালি, বেলুড়, শ্রীরামপুর, শেওড়াফুলি—পরপর স্টেশনে সিগন্যালের অপেক্ষায় ঘন্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছে যাত্রীবোঝাই লোকাল ট্রেন। প্রবল দুর্ভোগে জেরবার হতে হয়েছে রেলযাত্রীদের।
লিলুয়ার পাশাপাশি টিকিয়াপাড়া কারশেডে জল জমার ফলে পূর্ব রেলের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব রেলের পরিষেবাও ব্যাহত হয়। হাওড়া-মেদিনীপুর লাইনের একাধিক লোকাল বাতিল করতে বাধ্য হয় রেল। সময় পরিবর্তন করা হয় একাধিক ট্রেনের। এদিন সকাল ১০টার পাণ্ডুয়া লোকাল হাওড়া স্টেশনে ঢোকে দুপুর পৌনে ২টো নাগাদ। মেয়ের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসছিলেন সনাতন ভক্ত। ট্রেন থেকে নেমে বললেন, ‘মনে হয়, আজ আর ডাক্তার দেখাতে পারব না। ফিরব কীভাবে, সেটাও চিন্তার।’ সকাল ৭টা ৩৮ মিনিটের বর্ধমান লোকাল নির্ধারিত সময়ে ছাড়লেও হাওড়া স্টেশনে ঢোকে বেলা ১টা ৫৫ মিনিটে। চুঁচুড়া থেকে সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ এই ট্রেনে ওঠেন হাইকোর্টের কর্মী আনসার আলি। তাঁর কথায়, ‘চন্দননগরে এক ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকল ট্রেন। এরপর শ্রীরামপুরে ৪৫ মিনিট দাঁড়াল। শেষে লিলুয়ায় এসে আরও প্রায় দেড় ঘণ্টা। রেললাইনে যেভাবে জল জমে রয়েছে, হেঁটে আসাও সম্ভব ছিল না।’ সকাল সাড়ে ৯টার তারকেশ্বর লোকাল যখন হাওড়া স্টেশনে ঢুকল, ঘড়ির কাঁটা তখন আড়াইটে ছুঁইছুঁই। সেই ট্রেনের যাত্রী শেখ নাজির, প্রসূন সরকাররা বলেন, ‘রিষড়া থেকে হাওড়া পর্যন্ত আসতেই চার ঘণ্টা লেগে গেল। লিলুয়া কারশেডের ওখানে দু’ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছি।’
লোকাল ট্রেনের উপর নির্ভরশীল হুগলির নিত্যযাত্রীদের এদিন সব থেকে বেশি সমস্যায় পড়তে দেখা গিয়েছে। হুগলির গ্রামীণ এলাকা থেকে বহু ব্যবসায়ী সবজি নিয়ে হাওড়ায় আসেন। এদিন ট্রেন অত্যধিক লেটের চক্করে পড়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি বড়বাজার, মঙ্গলাহাট থেকে পাইকারি দরে পুজোর জামাকাপড় কিনে হুগলিতে ফিরতেও কালঘাম ছুটে গিয়েছে খুচরো বিক্রেতাদের। নিত্যযাত্রীদের অনেকে বালি স্টেশনে নেমে অ্যাপ ক্যাব ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু সড়কপথে তীব্র যানজট ও সুযোগ বুঝে চালকরা আকাশছোঁয়া ভাড়া হাঁকায় সমস্যার খুব একটা সুরাহা হয়নি। শেওড়াফুলি থেকে গৃহপরিচারিকার কাজে রোজ কলকাতায় আসতে হয় মিতালি দে, পূজা দে, প্রতিমা মাঝিদের। এদিন যে এতটা ভোগান্তি হবে আঁচ করতে পারেননি তাঁরা। মেমারি লোকাল থেকে নেমে তাঁরা বলছিলেন, ‘যেসব ফ্ল্যাটে আমরা কাজ করি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবারের লোকজন সকাল সকাল অফিসে বেরিয়ে যান। এখন পৌঁছলে কাউকে পাবও না। একদিনের বেতন কাটা গেল আমাদের।’