শান্তনু দত্তগুপ্ত: আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি কালাম সাহেবকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, মহাভারতে আপনার সবচেয়ে পছন্দসই চরিত্র কোনটি? রসিক মানুষ ছিলেন। সভাকক্ষে বসে থাকা জনতাকে পালটা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনারা আন্দাজ করুন দেখি!’ প্রথম নাম উড়ে এসেছিল, অর্জুন। মাথা নেড়েছিলেন কালাম সাহেব। তারপর কৃষ্ণ। উত্তর এল, না। একে একে কর্ণ, যুধিষ্ঠির সবাই হার মানলেন। ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে হাসি ঝুলছে। সাসপেন্সের মোড়ক ছাড়িয়ে নিজেই উত্তরটা দিয়েছিলেন এ পি জে আব্দুল কালাম—‘বিদুর’। কেন? বিদুর কেন? প্রত্যেকের চোখে তখন এই একটিই প্রশ্ন। খানিক থেমে উত্তর দিলেন আমাদের দেশের সর্বকালের অন্যতম শিক্ষিত রাষ্ট্রপতি, ‘ঠিককে ঠিক, আর ভুলকে ভুল বলার জন্য। সঠিক জায়গায় প্রশ্ন করতে ভয় না পাওয়ার জন্য।’
বড় কঠিন বিষয়বস্তু এই প্রশ্ন করা। আমাদের মনে প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে প্রশ্ন। কিন্তু আমরা তা প্রকাশ করছি না। করতে পারছি না। ভয়ে। কখনও ভয় সাংসারিক অশান্তির। কখনও অফিসে বসের কোপে পড়ার। কখনও নেতা-নেত্রী বা তাদের অনুগামীদের, সরকারের। এই বোধহয় হারিয়ে গেল নিরাপত্তা। শান্তি। চলে গেল চাকরি। প্রশাসন ভ্রু কুঁচকে দেখল। পুলিশ তুলে নিয়ে গেল। তাই আমরা প্রশ্ন করছি না। সবটাই ভয়। কিছু না কিছু হারানোর।
বেকার যুবক বা যুবতী রাজনৈতিক দলকে
ভোট দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন করছে না, চাকরিটা কেন পেলাম না। বছরে দু’কোটি চাকরি হয়নি কেন? সরকারি হিসেবই বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি হয়েছে মাত্র ৭ লক্ষ ২২ হাজার। আবেদন করেছিলেন কত যুবক-যুবতী? ২২ কোটির উপর। তারপরও কি মহামান্য ভারত সরকারকে প্রশ্ন করা যাবে না?
জিএসটি ‘টু পয়েন্ট ও’ নিয়ে দেদার প্রচার চলছে। অধিকাংশ দেশি কোম্পানি প্রধানমন্ত্রীর ছবি দিয়ে জিএসটি কমে যাওয়ার ধ্বজা নেড়ে ‘ওয়াহ ওয়াহ’ করছে। গাড়ি-বাইকের দাম আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে। কিন্তু আমরা প্রশ্ন করতে পারছি না যে, চাল-ডাল-তেলের দাম কমল না কেন? এখানেই প্রশ্ন শেষ হয়ে যাচ্ছে না! কারণ ভোজ্য তেল, ডালজাতীয় পণ্যের দাম এই পর্বে আচমকা বেড়ে গিয়েছে। কেন? সরকারি যুক্তি হল, অতিবর্ষণ। সত্যিই কি তাই? বৃষ্টি-বাদলা থেমে গেলে তাহলে সবেরই দাম কমে যাবে? সেই গ্যারান্টি সরকার দেবে তো? আর একটা প্রশ্ন—বেশ কিছু নিত্যপণ্য কেন ২২ সেপ্টেম্বরের ঠিক আগে চার টাকা বেড়ে, ওই তারিখের পর দু’টাকা কমল? এর উত্তর কে দেবে? প্রস্তুতকারী সংস্থা? দোকানদার? নাকি অর্থমন্ত্রী?
প্রশ্নের ধারা খানিক বদল করা যাক। একটু রাজনীতি হোক (যদিও বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্য—সবই এখন রাজনীতির পর্যায়েই নেমে গিয়েছে)। বিহার ভোটের আগেই আচমকা কেন ভোটার তালিকার ইন্টেনসিভ রিভিশন করতে হল? কেন্দ্রের কীসের ভয়? নাকি খোলসা করে বলতে গেলে ভয়টা বিজেপির? লোকসভা নির্বাচন যে ভোটার তালিকায় হয়েছিল, তাতে ভোট করালে কি শাসকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ত? নাকি পায়ের তলা থেকে ভোটব্যাঙ্কের মাটি সরে যেত? এখন চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, মোট ৬৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। তাদের সবাই হয় মারা গিয়েছে, না হলে অন্যত্র চলে গিয়েছে। অন্তত তেমনটাই দাবি কমিশনের। ধরে নেওয়া যাক, তাদের হিসেব ঠিক। নাম যোগ-বিয়োগ করতে কোথাও কোনও ভুল হয়নি। বুথ লেভেল অফিসাররা প্রত্যেক ভোটারের বাড়ি গিয়েছেন, ফর্ম পূরণ করিয়েছেন, নথি সংগ্রহ করেছেন এবং দপ্তরে ফিরে এসে ১০০ শতাংশ সততার সঙ্গে তা জমা করেছেন। ধরে নেওয়া যাক, বিরোধী এবং গদি মিডিয়ার বাইরে থাকা সংবাদমাধ্যমগুলি বিএলওদের বিরুদ্ধে যা অভিযোগ করছে, সব ভুল। সব বকওয়াস। শাসক এখানে কোনওরকম প্রভাব খাটায়নি। পার্টির লেটারহেডে চিঠি দিয়ে একটি কেন্দ্রের ৮০ হাজার সংখ্যালঘু ভোটারকে বাদ দেওয়ার ‘আর্জি’ও জানায়নি। তারপরও কিন্তু বিষয়টা কম উদ্বেগের নয়। কেন? কমিশনের হিসেবই বলছে, এক বছরে ৩৮ লক্ষ মানুষ বিহার ছেড়ে চলে গিয়েছেন। এই হিসেব সত্যি হলে তা কিন্তু নীতীশ কুমার এবং আমাদের বিশ্বগুরুর জন্য রীতিমতো উদ্বেগের। কেন বিহার ছাড়ছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ? কারণ, কাজ নেই। নিরাপত্তা নেই। সামাজিক সুরক্ষা নেই। গত ৪০ বছরেও তা বিহারে তৈরি হয়নি। মাথা পিছু আয়ে বিহার ১৯৯০ সালে সবার নীচে ছিল, ২০০৫ সালে এবং এই ২০২৫’এও। অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদি ও নীতীশ কুমার যতই উন্নয়নের দাবি তুলে ভোটের নেত্য করুন না কেন, কলসিটা ফাঁপাই। তারপরও কি মোদিজিকে প্রশ্ন করাটা অযৌক্তিক?
বিহারে ২৫ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে ১০ হাজার টাকা করে পাঠানো হচ্ছে। এসআইআরে কত লক্ষ মহিলার নাম বাদ পড়ার পর? ২২ লক্ষ। এখানে দু’টি প্রশ্ন করা যায়। ১) এই মহিলারা তাঁদেরই ভোট দেবেন, এটা নিশ্চিত হয়েই কি নীতীশ কুমার এবং নরেন্দ্র মোদি টাকাটা ট্রান্সফার করলেন? ২) নাকি ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণের পরও কি আপনারা নিশ্চিত নন যে, সত্যিই শুদ্ধ ভোটাররা চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছেন? তাই কি মরিয়া খয়রাতি করতে হচ্ছে? কিন্তু এই প্রশ্ন কেউ আপনাদের করবে না। করলেও আপনারা সোজা উত্তর দেবেন না। প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন, যা করছেন সেটাই অনেক। দেশবাসীর উপর দয়া করছেন আপনারা। আর যুক্তি সাজাতে গেলে তুলনা টানবেন জওহরলাল নেহরুর, কংগ্রেসের ৬০ বছরের শাসনের, জরুরি অবস্থার। বলবেন, ওরা কী করেছিল? আমাদের প্রশ্ন করবে না। যাও আগে নেহরুকে জিজ্ঞেস করে এসো দেশভাগ কেন হয়েছিল। যাও ইন্দিরা গান্ধীকে জিজ্ঞেস করে এসো, কেন পাকিস্তান দখলের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি পিছিয়ে এসেছিলেন। তারপর মোদি সরকারকে প্রশ্ন করার সাহস দেখাবে। তারপরও অবশ্য উত্তর মিলবে না। ইতিহাস আঁকড়ে ভবিষ্যতের দিকে পেছন ফিরে বসে থাকবেন তাঁরা। বদলে দেবেন ইতিহাসের পাতাও। সংঘ কেন স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্বাসী ছিল না, কেন ভারতের পতাকার উপর তাদের গেরুয়া ধ্বজার অহংকার নাক উঁচু করে থাকত, কেন সাভারকার মুচলেকা দিয়ে ব্রিটিশদের সামনে নতজানু হয়েছিলেন, কেন সংঘ দেশভাগের পক্ষেই কলকাঠি নেড়েছিল... এইসব প্রশ্ন করা যাবে না। তাহলেই তুমি দেশদ্রোহী। দেশের উন্নতি চাও না। আরে কংগ্রেসের উপর বিরক্ত হয়েই না দেশবাসী বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছে! তার মানে তো এই নয় যে, আগের ৬০ বছরের ধুয়ো তুলে আপনারাও চোখ উলটে থাকবেন! আগের সরকার রিগিং করলে আপনারা ভোট চুরি করবেন! প্রশ্ন যদি করতেই হয়, তাহলে কংগ্রেসকে করব না। করব বিজেপিকেই। করব মোদিজিকেই। কারণ, ক্ষমতায় তাঁরাই আছেন। প্রজাতন্ত্র ও গণতন্ত্রের ফারাক কোথায়? প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রনায়ককে নির্বাচিত করেন সাধারণ মানুষ। আর গণতন্ত্রে আম আদমিই শেষ কথা। তারাই শাসক, তারাই পরিচালক। নির্বাচনের পর যাঁকে মাথার উপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জনতা বসিয়েছে, তাঁর থেকে জবাবদিহি চাওয়ার অধিকার আলবাৎ আছে। ১০০ শতাংশ আছে। মজার বিষয় হল, সংবিধান অনুযায়ী আমাদের রাষ্ট্র হল ডেমোক্র্যাটিক-রিপাবলিক। অর্থাৎ সাধারণতান্ত্রিক গণতন্ত্র। এখানে জনতা রাষ্ট্রনায়ক বাছবে, তার থেকে কৈফিয়ৎও চাইবে। সংবিধান সেই অধিকার দিয়েছে আমাদের। জওহরলাল নেহরু যদি এখন প্রধানমন্ত্রী থাকতেন, এই প্রশ্নগুলো আমরা তাঁকেই করতাম। ইন্দিরা গান্ধী হলেও সমীকরণ বদলে যেত না। জরুরি অবস্থা জারি করলেও না। আর এখন যদি রাহুল গান্ধী, স্ট্যালিন বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী হয়ে দিল্লির মসনদে বসেন, এমন সব প্রশ্নেরই উত্তর তখন তাঁদের দিতে হবে। ভারতের সরকার কোনও একনায়কের তল্পিবাহক নয়। সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। তাহলে কেন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নিরিখে নরেন্দ্র মোদির ভারত কেন ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫১ নম্বর স্থানে থাকবে? বাক স্বাধীনতায় কেন আমাদের স্থান ৩৩টি প্রধান দেশের মধ্যে ২৪ নম্বর? এর উত্তরও কি আমরা সরকারের কাছে চাইতে পারব না? আইনের ফাঁক বা রাজরোষ কিন্তু খুব বেশিদিন আম জনতাকে থামিয়ে রাখতে পারবে না। আজ না হয় কাল তারাও প্রশ্ন করবে। বিদুর হওয়ার জন্য যোদ্ধা হওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু দরকার বুকের খাঁচাটুকু। অন্যায়কে সমর্থন না করে যা সঠিক, তার পাশে দাঁড়ানোর জন্য। আর হ্যাঁ, একটা মোক্ষম প্রশ্ন তো রয়েইছে ভারতবাসীর আস্তিনের নীচে—১৫ লক্ষ টাকা কবে প্রত্যেক নাগরিকের অ্যাকাউন্টে ঢুকবে?