তর্ক-বিতর্ক
তর্ক-বিতর্ক
পক্ষে
রাজশ্রী চক্রবর্তী
কাজের ক্ষেত্রে অনেক সময়ে নিরাশ হতে হবে ভেবেও কিছু কাজ করে চলা একরকম মানসিক প্রশান্তি দেয়। এই যেমন কিছু হোক না হোক, চেষ্টা তো করলাম! কিন্তু এই বোধটাও অচেতন মনে একটা নীরব আশা থেকেই জন্মায়। ডাক্তার চিকিৎসা শুরু করেন রোগীর রোগ সারবে এই আশায়। পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দেয় জীবনের এক ধাপ এগবে এই আশায়। সৈনিক নিজের জীবন তুচ্ছ করে, দেশকে সুরক্ষিত রাখবে এই আশায়। মানুষ ক্লান্তির শেষে আশ্রয় খোঁজে শান্তির আশায়। -বাচিক শিল্পী
সব্যসাচী প্রামাণিক
আমাদের প্রতিনিয়ত কোনও না কোনও কাজ করে যেতে হয়। কাজ করতে প্রয়োজন উদ্যম। আর সেই কাজের ফল যদি মনের মতো না হয়, তখন অবশ্যই দুঃখ হয়। কিন্তু আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি যে কোনও কাজ যদি আমরা ভালোবেসে অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গে করি তাহলে তার মধ্যেও একটা আনন্দ আছে? সেটা কিছু করার আনন্দ। মানুষের জীবন আজ ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে অতিরিক্ত চাহিদায়। সব চাহিদা আমাদের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে মনখারাপ থেকেই যায় সবসময়। যার যেটা প্রয়োজন, সেই প্রয়োজনীয় কাজ বেশি বেশি করতে পারলেই জীবন সাফল্যের দিকে এগিয়ে যায় ক্রমশ। -ছাত্র
সাগরময় অধিকারী
শ্রমজীবী, চাকরিজীবী, বুদ্ধিজীবী সকলেই কাজ করেন শ্রমের ফল আশা করেই। বেঁচে থাকতে হলে কাজ করতেই হবে। কাজের বিনিময়ে পাওয়া যাবে অর্থ, যা দিয়ে জীবন নির্বাহ হবে। শুধু পরিবারের ভরণপোষণ নয়, শ্রমের বিনিময়ে গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অনেক জনহিতকর কাজ করতে পারেন। জনহিতকর কাজ করতে করতে আরও সুফল পেতে আরও মরিয়া হয়ে ওঠেন কাজের উদ্যোক্তা। তিনি কাজে যত সফল হন, ততই তাঁর জেদ বাড়ে এবং এই জেদই তাঁকে লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে। নাম যশ প্রতিপত্তি সবই আসে কাজের বিনিময়ে। সুতরাং ফলের আশা নিয়েই কাজের ময়দানে নামা উচিত। পরিশ্রম বিনা আমাদের কোনও অভীষ্ট সিদ্ধ
হয় না। ---অবসরপ্রাপ্ত কলেজ গ্রন্থাগারিক
শোভন সেন
কবি কোলরিজ লিখেছিলেন, আশা ছাড়া কাজ করা ছাঁকনিতে মধু জমানোর মতো। যে কোনও কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করাটাই ব্যক্তির প্রথম লক্ষ্য। এছাড়া কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত উপার্জন বা প্রশংসা প্রাপ্তির উদ্দেশ্য। এইগুলি প্রত্যেকটাই কাজের ইপ্সিত ফল। উদ্দেশ্যবিহীনভাবে, ফললাভের আশা না করে শুধুই কর্তব্য ভেবে কাজ করে যাওয়া কেলভিন স্কেলে শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রার মতোই বাস্তবিক অসম্ভব। কাজের ফল হল যাত্রার গন্তব্য, যাত্রাপথের প্রেরণা। প্রতিবার কারও প্রয়াস সফল না হতেই পারে, কিন্তু যে কোনও প্রচেষ্টায় ব্যক্তির সাফল্যের ফললাভের ইচ্ছা ও কর্মাভিমুখকে অস্বীকার করা যায় না। -শিক্ষক
বিপক্ষে
সুনীতা নাইয়া
স্বয়ং প্রভু শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, কর্ম করে যাও ফলের আশা কোরো না। আসলে আমরা সবসময়ই ভেবে থাকি যে আমি যদি কিছু কাজ করি, তার পরিবর্তে কিছু পাব। এটা এক প্রকারের নিজ স্বার্থের কথা ভাবা। যেমন মানুষ মানুষের উপকার করলে সে আশা রাখে যে আগামী দিনে সেও হয়তো তার উপকার করবে। এই আশা একেবারেই রাখা উচিত নয়। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুই পরিবর্তিত হয়। তাই মন দিয়ে কর্ম করলে ফল অবশ্যই পাবে কিন্তু ফল পাব বলেই শুধু কর্ম করতে হবে— এইরকম মনোবৃত্তি রাখলে কর্মে অনেক ক্ষেত্রেই সফলতা আসে না। তাই এই মনোবৃত্তি দূরে রেখে কর্ম করে এগিয়ে যাওয়া উচিত। --চাকুরিজীবী
কৃষ্ণেন্দু বিশ্বাস
ফলের আশা না করে কাজ করা অসম্ভব? কথাটা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। বাস্তবের আয়নায় অনেক সহৃদয় মানুষের কল্যাণকর ও জনহিতকর কাজ করার নানা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়াস জলছবিতে হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন। তাঁদের কাছে কাজ শখের বশে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ওইটাই তাঁদের নেশা ও বাঁচার আনন্দ। তাঁরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন বাঁচার জন্য কাজ অথবা কাজের জন্য বাঁচা। যাঁরা সমাজের বুকে এমন কাজ করেন, তাঁরা ফলের আশায় বা পুরস্কারের লোভে কাজ করেন না। তবে ভালো কাজ সুস্থ ও সঠিক পরিকল্পনা মাফিক করলে তার সুফল এমনিই সুদূরপ্রসারী হবে। ---স্কুলশিক্ষক
অরিজিৎ দাস অধিকারী
‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।’ কর্মে তোমার অধিকার ফলে নয়। শ্রীমদ্ভগবদগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই উপদেশ দিয়েছিলেন অর্জুনকে। যা যুগে যুগে প্রমাণিত সত্য। বিদ্যাসাগর থেকে রামমোহন, নেতাজি থেকে গান্ধীজি সবাই সমাজের জন্য কাজ করে গিয়েছেন, বিখ্যাত হওয়ার জন্য নয়। কালের কষ্টিপাথরে সময় তাঁদের জায়গা করে দিয়েছে। বর্তমানে কিছু মানুষ নিজেরাই নিজেদের বিশ্বসেরা মনে করে টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। নানা স্থানে নিজের নাম খোদাই করতে অর্থ সাহায্য করছে, নিজের মূর্তি বানাচ্ছে, ঢাকঢোল পিটিয়ে সংবর্ধনা নিচ্ছে, নিজেকে বিশেষণের পর বিশেষণে ভরিয়ে তুলছে। সময়ের সোপানে তাসের ঘরের মতোই তারা ভেঙেও পড়ছে। তাই আমি দৃপ্ত কণ্ঠে বলব ফলের আশা না করে মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করলে ফল আপনি এসে ধরা দেয়। --লেখক
দেবাশিস হাজরা
‘কাজ করে যাও; ফলের আশা কোরো না’—ছোটবেলা থেকে শুনে আসা এই আপ্তবাক্যটিই সঠিক। ফলের আশা না করে কাজ করলে বরং কাজের দিকেই পুরোপুরি মনোনিবেশ করা সম্ভব। নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে পরিপূর্ণ নিষ্ঠা-অধ্যবসায় আর নিয়মানুবর্তিতায় কাজ এগিয়ে যাবে! তাহলে সহজে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনো যাবে। বর্তমান জটিল সমাজব্যবস্থায় মাত্রাতিরিক্ত সম-মেধাসম্পন্ন যোগ্য প্রার্থীদের ভিড়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বেগ পেতে হলেও স্বঅর্জিত জ্ঞান-বিদ্যা মেধা কখনওই নিরাশ করবে না। এগিয়ে দেবে সঠিক পথেই। এভাবেই ফলের আশা না করে নিজেকে গড়ে তুলতে পারলেই তার সুফল মিলবে আপনা-আপনিই। ---সরকারি চাকুরিজীবী